বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় কেবল পাঠ্যবইনির্ভর জ্ঞানদান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আধুনিক, দক্ষ ও প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষক। এই বাস্তবতায় শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। তার মধ্যে “লেইস (LAISE) ট্রেনিং” একটি আলোচিত ও কার্যকর প্রশিক্ষণ মডেল হিসেবে বিবেচিত। সাধারণভাবে (LAISE) বলতে বোঝায় এমন একটি কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষকদের নেতৃত্বগুণ Learning Acceleration in Secondary Education (LAISE) Project। ৩,৫০৫ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট – লেইস (LAISE) ট্রেনিং! লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (LAISE) প্রকল্প শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, নেতৃত্বগুণ বিকাশ ও আধুনিক পাঠদান নিশ্চিত করতে সরকারের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।
একসঙ্গে সমন্বিতভাবে শেখানো হয়। এটি কেবল ক্লাস নেওয়ার কৌশল নয়, বরং একজন শিক্ষককে শিক্ষা-নেতা হিসেবে গড়ে তোলার একটি প্রক্রিয়া।
লেইস ট্রেনিং সাধারণত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রশিক্ষণ সংস্থা যেমন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বা জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)–এর তত্ত্বাবধানে আয়োজন করা হয়। এটির কার্যদিবস ৫৬দিন। অনেক ক্ষেত্রে জেলা বা আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও এ ধরনের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে থাকে অংশগ্রহণমূলক আলোচনা, দলগত কাজ, সমস্যা বিশ্লেষণ, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, মাইক্রো-টিচিং এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময়। প্রশিক্ষণকাল কয়েক দিন থেকে শুরু করে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে, নির্ভর করে কোর্সের ধরন ও লক্ষ্যভিত্তিক দক্ষতার ওপর।
কোন ধরনের শিক্ষকেরা এখানে সুযোগ পান—এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা, বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। তবে তালিকায় আপনার নাম থাকলেও আপনি কোন কারণে সুযোগ নাও পেতে পারেন। লেইস প্রজেক্টের অধীনে মোট ২৭১৮০জন নতুন বা নবীন মাধ্যমিক শিক্ষক যাদের বয়স ৪০ বছরের মধ্যে তারা ৫৬ দিন ব্যাপী এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। এখন এখানে একটি প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য শিক্ষকরা কি বিশেষ করে যাদের বয়স ৪০ বছরের বেশি বা ৪০ বছরের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও লেইস ট্রেনিং যেকোন কারণে পাবে না তাদের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত আসবে। সেই ক্ষেত্রে যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য তা হলো অনেক সময় নবীন শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক কিংবা একাডেমিক সুপারভাইজারদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যাতে তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারেন। নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সাপ্তাহিক ছুটি: শুক্রবার ও শনিবার সাধারণত একাডেমিক/সহশিক্ষা কার্যক্রম থাকায় ছুটি থাকে না।
তবে কোনো প্রোগ্রাম না থাকলে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছুটি ঘোষণা করা হতে পারে।
দৈনন্দিন রুটিন (সুশৃঙ্খল ও কর্মব্যস্ত জীবন)
* ৬.৩০–৭.০০ : সমাবেশ
* ৭.০০–৯.০০ : নাস্তা ও গোসল
* ৯.০০–১০.৪৫ : ক্লাস
* ১০.৪৫–১১.১৫ : চা-নাস্তার বিরতি
* ১১.১৫–১২.৪০ : ক্লাস
* ১২.৪০–২.০০ : দুপুরের খাবার, নামাজ ও বিশ্রাম
* ২.০০–৩.৪৫ : ক্লাস
* ৩.৪৫–৪.০০ : বিরতি
* ৪.০০–৫.৩০ : ক্লাস
* ৭.০০–৮.০০ : লাইব্রেরি সেশন
* ৮.০০–৯.০০ : রাতের খাবার
করণীয় কাজগুলোঃ
একটি সুশৃঙ্খল ও কর্মব্যস্ত দৈনন্দিন জীবনই লেইস ট্রেনিং-এর মূল ভিত্তি।
গ্রুপে প্রথম হয়ে জাপান শিক্ষা ট্যুরের সুযোগ পেতে করণীয়
ক) নিয়মিত ক্লাসে মনোযোগ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ
খ) প্রতি ১০ দিন পরপর অনুষ্ঠিত ৪টি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল
গ) প্রশিক্ষকদের সঙ্গে শালীন ও সম্মানজনক আচরণ
ঘ) সহপাঠীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা
ঙ) বিভিন্ন কমিটিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন
চ) ক্রীড়া প্রতিযোগিতা (কেরাম, দাবা, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, কার্ড ইত্যাদি) তে অংশগ্রহণ ও পুরস্কার অর্জন
ছ) সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক ও সিমুলেশন ক্লাসে দক্ষ উপস্থাপন
জ) নিয়মিত সকালের পিটি (শারীরিক প্রশিক্ষণ) তে অংশগ্রহণ
সম্মানি ও সুযোগ-সুবিধাঃ
🔸 ৫৬ দিন শেষে মোট সম্মানি: ৩৯,৪০০ টাকা
🔸 থাকা, খাওয়া, পোশাক ও শিক্ষা ট্যুরসহ সব ব্যয় সম্পূর্ণভাবে লেইস প্রোগ্রামের অর্থায়নে সম্পন্ন হবে।
লেইস ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণকারীরা নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান। এর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ উপকরণ, মডিউলভিত্তিক গাইডলাইন, বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষকের সরাসরি দিকনির্দেশনা, সহকর্মীদের সঙ্গে নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে সনদপত্র। কিছু ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ভাতা বা যাতায়াত সুবিধাও প্রদান করা হয়। তবে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আধুনিক পাঠদান কৌশল, শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নতুন ধারণা এবং ডিজিটাল টুল ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন।
প্রশিক্ষণটি করলে কি পেশাগত উন্নয়ন ঘটে—এর উত্তর নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ, লেইস ট্রেনিং শিক্ষকদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনায় দক্ষতা বাড়ায় এবং সমস্যা সমাধানে বাস্তবমুখী কৌশল শেখায়। একজন শিক্ষক যখন নতুন কৌশল প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারেন, তখন তার পেশাগত সন্তুষ্টিও বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে পদোন্নতি, নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ বা প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সবশেষে বলা যায়, লেইস ট্রেনিং কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; এটি শিক্ষকদের মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বগুণ উন্নয়নের একটি সমন্বিত উদ্যোগ। শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষকদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি, আর সেই পথে লেইস ট্রেনিং একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একজন দক্ষ, আধুনিক ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে লেইস ট্রেনিং হতে পারে আপনার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
যারা লেইস ট্রেনিং অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন তাদের তালিক দেখতে এখানে ক্লিক করুন
Leave a Reply