বেসরকারি স্কুল-কলেজে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর নিয়মিত সচিবের পদ শূন্য হয়ে যায়। বর্তমানে প্রশাসন শাখার একজন অতিরিক্ত সচিব রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সফটওয়্যারের ডেমো প্রদর্শন সংক্রান্ত সভা আয়োজন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, নিয়মিত সচিব না থাকায় সফটওয়্যারের ডেমো প্রদর্শনীর তারিখ নির্ধারণ বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও বড় নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ সচিবের উপস্থিতি প্রয়োজন হয়। কবে নাগাদ নতুন সচিব নিয়োগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেমো প্রদর্শনী হবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ বর্তমানে জোরদারভাবে চলছে। ফলে প্রশাসনিক ব্যস্ততার মধ্যেই বদলি সফটওয়্যারের বিষয়টি কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, নিয়মিত সচিব না থাকায় সভা আয়োজন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের শুরুতে বদলির কোনো সুযোগ ছিল না। তারা কেবল গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুনরায় আবেদন করে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ পেতেন। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে ইনডেক্সধারী শিক্ষকরা আবেদন করতে পারলেও চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেই সুযোগ বন্ধ করে দেয়। এতে অনেক শিক্ষক দূরবর্তী বা অনুকূল নয় এমন কর্মস্থলে দীর্ঘদিন আটকে পড়েন।
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠন ধারাবাহিক আন্দোলন, স্মারকলিপি ও মানববন্ধনের মাধ্যমে বদলি চালুর দাবি জোরদার করে। আন্দোলনের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বদলি নীতিমালা প্রণয়ন করে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রস্তাবিত সফটওয়্যারে শিক্ষকরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন এবং শূন্যপদের ভিত্তিতে মেধা, জ্যেষ্ঠতা ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলি আদেশ জারি হবে—এমন কাঠামো রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে একাধিক জটিলতায় কার্যক্রমটি বারবার পিছিয়েছে। শিক্ষকদের একটি পক্ষ নীতিমালার কিছু ধারা নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করলে আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পাশাপাশি সফটওয়্যার প্রস্তুত ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম (ডেমো) সম্পন্ন না হওয়ায় চূড়ান্ত বাস্তবায়ন আটকে আছে। যদিও সংশোধিত বদলি নীতিমালা ইতোমধ্যে জারি করা হয়েছে, কিন্তু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সম্পূর্ণ প্রস্তুত না থাকায় মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বয়ংক্রিয় বদলি সফটওয়্যার চালু হলে শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে, তদবির ও মানবিক বিবেচনার নামে অনিয়ম কমবে এবং দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে স্থবিরতা কাটবে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক সংকট নিরসনেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও আইনি জটিলতা নিরসন ছাড়া এই উদ্যোগ সফল করা কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বহুল প্রত্যাশিত বদলি কার্যক্রম এখনো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। নিয়মিত সচিব নিয়োগ, সফটওয়্যারের ডেমো প্রদর্শনী সম্পন্ন এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই বাস্তবে বদলি কার্যক্রম শুরু হতে পারে। শিক্ষক সমাজ এখন তাকিয়ে আছে—কবে তাদের দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তব রূপ পাবে।
Leave a Reply