বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কাঠামোর দুই প্রান্তে আজ বিরাজ করছে এক গভীর বৈষম্য—একদিকে সরকারি শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা, অন্যদিকে এমপিওভুক্ত (বেসরকারি) শিক্ষক-কর্মচারীদের অনিশ্চয়তা। উভয় শ্রেণির মানুষই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, কিন্তু অবসরের পর তাদের ভাগ্য যেন সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। একপক্ষে নিয়মতান্ত্রিক প্রভিডেন্ট ফান্ডে নির্ভরযোগ্য জীবন, আর অন্যপক্ষে কল্যাণ তহবিলের জটিলতা, অপেক্ষা আর চোখের জলে ভরা বার্ধক্য। দুই পেশাজীবিই কিন্তু এদেশের একই কাজ করে অথচ তাদের শেষ জীবনের প্রাপ্যতা কতইনা করুনাময় কতটা অনিশ্চয়তা ভরা এই হল আমাদের দেশের বৈষম্যভরা সমাজ ব্যবস্থা।
আমি আমার এই লেখায় পর্যায়ক্রমে তুলে ধরবো সরকারি চাকরিজীবীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড (GPF) এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ তহবিল (Welfare & Retirement Fund)—এই দুই ব্যবস্থার মূল কাঠামোগত পার্থক্য, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং মানবিক প্রভাব।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড:
এটি মূলত রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত এক সঞ্চয় তহবিল, যা ১৯৭৯ সালের General Provident Fund Rules অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সরকারি কর্মচারীর বেতন থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কাটা হয় (সাধারণত ১০–১২%) এবং সরকারের পক্ষ থেকেও সমপরিমাণ অর্থ “কন্ট্রিবিউশন” হিসেবে যোগ করা হয়। ফলে এখানে কর্মচারী ও সরকার—দু’পক্ষের যৌথ অংশগ্রহণে একটি শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো গড়ে ওঠে। এই ফান্ডের সমস্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে থাকে, যা ট্রেজারি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ তহবিল:
এই তহবিলের অর্থ আসে শুধুমাত্র শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কর্তনকৃত অংশ থেকে। যা পূর্বে ছিল ৪+২=৬% তবে বর্তমানে এটি ৬+৪=১০% তবে এখানে সরকারের কোনো সরাসরি আর্থিক তেমন কোন অবদান নেই, সরকারের এখানে সরাসরি প্রণোদনা দেওয়ার কথা থাকলেও তা সেভাবে দেয় না কিছু কিছু সময় সীড মানি হিসাবে দেওয়ার কথা থাকলেও তার বাস্তবে কোন প্রতিফলন আজ অবধি ঘটেনি বরং সরকার কেবল প্রশাসনিক অনুমোদন ও নীতিগত তত্ত্বাবধান করে। যা আবার অনেকটা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার উদ্দেশ্যে। এই তহবিলে সরকার সরসরি কোন অর্থ যোগান দেয় না অর্থাৎ শিক্ষকরা নিজেরাই নিজের অবসরের জন্য অর্থ জোগান দিচ্ছেন, অথচ সেই অর্থ সময়মতো পায় এর পিছনেও রয়েছে সরকারের লুটপাট তন্ত্রের হস্তক্ষেপ। সরকার এখানে বিভিন্ন সময় তার পোষা অনুগত কিছু লোকবল নিয়োগ করে যাদের উদ্দেশ্য হল এই অসহায় শিক্ষকদের অর্থ কিভাবে লুটপাট করা যায়। এই তহবিল গঠন করার উদ্দেশ্য ছিল অবসর জীবনে শিক্ষক কর্মচারীদের আত্ননির্ভশীল করা কিন্তু বর্তমানে এ যেন আত্মনির্ভরতার নাম করে এক প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও অবহেলার করুন দৃষ্টান্ত।
প্রভিডেন্ট ফান্ড:
এই ফান্ড পরিচালিত হয় হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (CGA) কার্যালয়ের মাধ্যমে, যার ওপর সংসদীয় ও নিরীক্ষা কমিটির সরাসরি নজরদারি থাকে। প্রতি বছর নিরীক্ষা (audit) হয়, ফান্ডের হিসাব প্রকাশিত হয়, এবং কর্মচারীরা তাঁদের বার্ষিক “GPF Statement” পান। এটি একটি কেন্দ্রীভূত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো।
অবসর ও কল্যাণ তহবিল:
এটি পরিচালিত হয় একটি স্বশাসিত “অবসর ও কল্যাণ তহবিল বোর্ড”-একটি রাজনৈতিক ও দূর্ণীতিপরায়ন কিছু আমলাদের এর মাধ্যমে, যেখানে শিক্ষক সমাজের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই। পরিচালনা পর্ষদে কয়েকজন আমলা ও মনোনীত শিক্ষক সদস্য থাকলেও, মাঠপর্যায়ের শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। কোনো বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় না, কোন শিক্ষক কর্মচারী কোনদিন জানতেও পারে না তার অবসর ও কল্যাণ ফান্ডে কতটাকা বিনিয়োগ আছে। এ যেন নিজের সম্পদ অন্যজনের হাতে তুলে দিয়ে নিজেই ভিখারির মত ভাগ্যবরণ করার নির্মম চিত্র। সবচয়ে হাস্যকর ও দৃষ্টিকটু যে বিষয় আমার জমাকৃত টাকা আমাকে পেতে এবং আবেদন নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়।
সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডে:
সরকার এই ফান্ডকে বিভিন্ন সরকারি বন্ড, সিকিউরিটিজ ও ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে। এতে কর্মচারীরা বার্ষিক ১০–১২% পর্যন্ত সুদ পান, যা চাকরির মেয়াদ শেষে একটি বড় অঙ্কে পরিণত হয়। অর্থাৎ এই ফান্ড শুধু সঞ্চয় নয়, এটি একপ্রকার লাভজনক বিনিয়োগও।
অবসর ও কল্যাণ তহবিলে:
এই ফান্ডের অর্থ প্রায় স্থবির। বিনিয়োগ নীতিমালা অস্পষ্ট, অনেক সময় অর্থ অকার্যকরভাবে ব্যাংক একাউন্টে পড়ে থাকে। শিক্ষক-কর্মচারীদের জমা অর্থ থেকে সুদের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদেও অর্থের মূল্য বাড়ে না, বরং প্রশাসনিক বিলম্বে তার কার্যকারিতা হারায়। সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো যে, এই বোর্ডে দ্বয়ের সুস্পষ্ট একটি গঠনতন্ত্র রয়েছে সেই গঠনতন্ত্রের আলোকে তা পরিচালিত হওয়ার কথা সেখান হতে কিভাবে অর্থ লোপাট হয়ে যায় আর তার দায়ভার কেউ নিতে চায় না এই ধরনের বক্তব্য কতটুকু যুক্তিযুক্ত।
তহবিলে ব্যবস্থাপনার যে নিয়ম তা আমি তুলে ধরছি আপনাদের সকলের জ্ঞাতার্থে- তহবিলের ব্যবস্থাপনা। (১) তহবিলের ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, বিনিয়োগ ও পরিচালনার দায়িত্ব পরিষদের উপর ন্যস্ত থাকিবে।
(২) পরিষদ এই প্রবিধানমালা অনুসারে অবসর সুবিধাদি পরিশোধের উদ্দেশ্যে তহবিলের অর্থ কোন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে জমা রাখিতে পারিবে।
(৩) পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান ও সচিবের যুগ্ম-স্বাক্ষরে তহবিলের ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হইবে, তবে প্রয়োজনে অনধিক দশ হাজার টাকা সচিবের একক স্বাক্ষরে উত্তোলন করা যাইবে।
(৪) দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য অনধিক পাঁচ হাজার টাকা সচিবের নিকট নগদ জমা রাখা যাইবে।
(৫) অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যানের অনুমোদনক্রমে, অনধিক একলক্ষ টাকা পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুমোদক্রমে এবং তদুদ্ধের টাকা পরিষদের অনুমোদনক্রমে উত্তোলন করা যাইবে।
উপরে যে গঠনতন্ত্রটি উল্লেখ করিলাম সেই গঠনতন্ত্রের আলোকে যদি তহবিলের টাকা লোপাট হয়ে যায় তার দায়ভার কে নিবে!
সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে:
অবসরের পর কর্মচারীকে মাত্র কয়েকটি আনুষ্ঠানিক ধাপ পেরিয়ে ফাইনাল সেটেলমেন্টের আবেদন করতে হয়। ২–৩ মাসের মধ্যেই ট্রেজারি অফিস থেকে পুরো অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল ও সময়নির্দিষ্ট।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে:
অবসরের পর তাদের আবেদন মাসের পর মাস বোর্ডে পড়ে থাকে। অনেক সময় ফাইল এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরে বছর পার হয়ে যায়। কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করার পরও পরিবার অর্থ পান না। এ যেন জীবনের শেষ অধ্যায়ে এক নির্মম অপেক্ষা।
প্রভিডেন্ট ফান্ড:
অর্থ মন্ত্রণালয়, হিসাব মহানিয়ন্ত্রক, অডিট বিভাগ ও সংসদীয় কমিটি—সব স্তরেই নিরীক্ষা হয়। কর্মচারীর ফান্ডের ব্যালান্স প্রতিবছর হালনাগাদ করা বাধ্যতামূলক।
অবসর ও কল্যাণ তহবিল:
এখানে কোনো কার্যকর নিরীক্ষা ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকরা জানেন না তাদের বেতন থেকে কর্তনকৃত অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা তা ব্যবহার করছে, আর কত টাকায় সুদ যোগ হচ্ছে। নেই এখানে বিন্দু মাত্র স্বচ্ছতা, সরকার প্রতিনিয়ত এই বোর্ডে তার পছন্দ মতো দুবৃত্তদের নিয়োগদান করে এই তহবিলের সদস্য করে। সেখানে তারা নিয়োগ হওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো গঠনতন্ত্র মোতাবেক যে তিনজন আমলা থাকে তাদের সাহায্যে কিভাবে এই হত দরিদ্র শিক্ষক কর্মচারীদের শেষ জীবনের সম্বল কিভাবে লোপাট করা যায়। এই অস্পষ্টতা ও জবাবদিহিতার অভাবই আজ শিক্ষক সমাজের ক্ষোভের মূল কারণ।
সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরের পর আর্থিকভাবে নিশ্চিন্ত থাকেন। তাঁদের কাছে থাকে সঞ্চয়, সুদ, পেনশন, চিকিৎসা ভাতা—সবকিছুই নিয়মিত।
অন্যদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা জীবনের শেষ পর্যায়ে আর্থিক সংকটে পড়ে যান। অনেকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে পারেন না, কেউ সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দেন, আবার কেউ নিজের প্রাপ্য অর্থের আশায় বছর কাটান। তাদের মুখের একটাই কথা—“আমাদের টাকা আমরা কবে পাব?” আমাদের শেষ জীবনের সঞ্চয় আমরা কোনদিন হাতে পাব।
| বিষয় | সরকারি চাকরিজীবীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড | এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ তহবিল |
|---|---|---|
| অর্থের উৎস | কর্মচারী + সরকারের যৌথ অবদান | শুধুমাত্র শিক্ষকদের বেতন থেকে কর্তন |
| পরিচালনা কর্তৃপক্ষ | অর্থ মন্ত্রণালয় ও CGA দপ্তর | অবসর ও কল্যাণ তহবিল বোর্ড |
| নিরীক্ষা ব্যবস্থা | নিয়মিত, বাধ্যতামূলক অডিট | প্রায় অনুপস্থিত বা অস্বচ্ছ |
| সুদ প্রদান | সরকার ঘোষিত বার্ষিক সুদ | অনিয়মিত, অস্পষ্ট |
| অর্থ বিতরণ সময় | ২–৩ মাসের মধ্যে | ৬ মাস থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বিলম্ব |
| শিক্ষক প্রতিনিধিত্ব | প্রযোজ্য নয় (রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ) | সরকার দলীয় অশিক্ষকদের নিয়োগদান করা হয় যাদের উদ্দেশ্য লুটপাট করা। |
| অবসরে নিশ্চয়তা | উচ্চ | বিন্দু মাত্র নিশ্চয়তা নেই কখন কোনদিন কোনসময় টাকা পাওয়া যাবে। |
| জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা | পূর্ণ | নেই কোন জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা |
দেশের শিক্ষক সমাজ শুধু পেশাজীবী নয়, তাঁরা জাতি গঠনের কারিগর। কিন্তু তাঁদের অবসর-পরবর্তী জীবন যদি দুঃখ, অবহেলা ও অপেক্ষায় ভরে থাকে, তবে সেটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পরাজয় ছাড়া আর কিছু নয়।
সরকারি চাকরিজীবীদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষকদেরও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এজন্য অবসর ও কল্যাণ তহবিলের গঠনতন্ত্রে যুগোপযোগী সংস্কার, শিক্ষক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, এবং সরকারের সরাসরি আর্থিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
শিক্ষকদের ঘামেই জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে—তাঁদের জীবনের শেষ প্রান্তটুকু যেন মর্যাদা, স্বচ্ছতা ও স্বস্তিতে ভরে ওঠে, সেই উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।
কারণ একজন শিক্ষক যদি নিশ্চিন্ত না থাকেন, তবে কোনো সমাজই প্রকৃত অর্থে আলোকিত হতে পারে না।
Leave a Reply