বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়ি ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ করার দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চললেও, আজ মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) পর্যন্তও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। ফলে আজই প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার যে আশা শিক্ষক সমাজ দেখছিলেন, তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য দুটি সূত্র মঙ্গলবার দুপুরে জানিয়েছে, বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবির বিষয়ে একমত। তাদের তিনটি দাবির মধ্যে বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ২০ শতাংশ বা ১৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করা হলে সেই অতিরিক্ত অর্থ সরকারের রাজস্ব বাজেটে কীভাবে যুক্ত করা হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো সেই আর্থিক সমীকরণ নিশ্চিত করতে পারেনি।”
তিনি আরও জানান, “এখন সামনে নতুন বেতন স্কেল গঠনের প্রস্তুতি চলছে। যদি এখনই বাড়ি ভাতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সেটি আরও বাড়বে, ফলে আর্থিক চাপ দ্বিগুণ হবে। এই অবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয় খুব সতর্ক অবস্থানে আছে। তাছাড়া বর্তমানে অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থ সচিব—দুজনেই দেশের বাইরে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।”
অন্যদিকে, শিক্ষকদের লাগাতার আন্দোলনের কারণে প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে টানা কয়েকদিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। তাদের কর্মসূচির পরবর্তী ধাপে “সচিবালয় অভিমুখে লং মার্চ”-এর ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সোমবার রাতে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা শিক্ষা সচিব রেহেনা পারভীনের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, বৈঠকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায় ও আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে কোনও ইতিবাচক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষকদের সংগঠন ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট’-এর সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী জানিয়েছেন, সরকারের টালবাহানা শিক্ষক সমাজ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, “আমরা শুনছি, কেউ কেউ বলছেন ১৫ শতাংশ দেওয়া যায় কি না—এমন চিন্তাও নাকি চলছে। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, আমাদের দাবি একটিই—মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা, ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং কর্মচারীদের জন্য ৭৫ শতাংশ উৎসব ভাতা। এর এক টাকাও কম হলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করব।”
আজিজী আরও বলেন, “আমরা সরকারের সঙ্গে সংঘাত চাই না, কিন্তু ন্যায্য দাবিতে আপস করব না। যদি সরকারের কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি আন্দোলন ভাঙার চেষ্টা করেন, শিক্ষক সমাজ তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। দেখব, ছয় লক্ষাধিক শিক্ষক পরিবারের সঙ্গে বিদ্রোহ করে কে টিকে থাকতে পারে।”
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থানরত শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রজ্ঞাপন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষকরা প্রতিদিন শহীদ মিনারে এসে যোগ দিচ্ছেন। মঙ্গলবার সকাল থেকেই সেখানে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে শত শত শিক্ষক ও কর্মচারীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
একজন আন্দোলনরত শিক্ষক বলেন, “আমরা বছরের পর বছর ধরে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছি, অথচ নিজের জীবনধারণের ন্যূনতম নিশ্চয়তা পর্যন্ত পাচ্ছি না। সরকার যদি আমাদের দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে, তবে দেরি না করে আজই প্রজ্ঞাপন জারি করা উচিত।”
সবশেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনার দরজা এখনও খোলা রয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা দেশে ফেরার পর বিষয়টি নিয়ে পুনরায় বৈঠক হতে পারে। তবে ততদিন পর্যন্ত শিক্ষকদের আন্দোলন অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই দেখা যাচ্ছে।
তবে শিক্ষা প্রশাসন যদি এভাবে গড়িমসি ও সময়েক্ষপনের ফন্দি ফিকির করে তাহলে তা হবে অত্যন্ত আত্নঘাতি সিদ্ধান। এবং এর ফলে শিক্ষায় যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে তার দায়িত্ব শিক্ষা প্রশাসনকেই নিতে হবে বলে মনে করেন সকল শিক্ষক সমাজ।
ত্
Leave a Reply