এবারেও যদি আমরা সফল না হই তাহলে কিন্তু সত্যিই আমরা পিছিয়ে পড়ব – ডেডলাইন ১৩ আগস্ট
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রযাত্রায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবদান অপরিসীম। স্বাধীনতার পর গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষকে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এরা ছিলেন মূল ভরসা। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় অসংখ্য বেসরকারি বিদ্যালয় ও কলেজ গড়ে ওঠে, যা মূলত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে চালু থাকে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—শিক্ষা বিস্তারের এই মহান দায়িত্ব পালনের পরও তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি।
এমপিওভুক্তির সূচনা হয়েছিল ১৯৮০-এর দশকে, যার মাধ্যমে সরকার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের একটি অংশ বহন করতে শুরু করে। সেই সময় এটি ছিল শিক্ষকদের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়, কিন্তু এটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান ছিল না। সরকারি শিক্ষকদের মত সমান বেতন, পেনশন, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা কিংবা বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের মতো সুবিধা তারা পাননি। ১৯৯০-এর দশকে ও পরবর্তী সময়ে বহুবার আন্দোলন, স্মারকলিপি প্রদান, অনশন, এমনকি প্রাণ হারানোর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও তাদের দাবি পূরণের পদক্ষেপ বারবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বাজেট সীমাবদ্ধতার অজুহাতে থমকে গেছে।
বঞ্চনার এই ইতিহাস আরও গভীরে গেলে দেখা যায়—প্রতিবার নতুন পে-স্কেল ঘোষণার সময় সরকারি শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য সুবিধা বাড়ালেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শুধু বেতন স্কেলেরই বৃদ্ধি ঘটে তাও নানা ধরনের গড়িমসির পর কিন্তু অন্যান্য দাবি গুলো বরাবরের মত উপেক্ষিত থাকে। শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা নষ্ট হয় যখন তাদের মাসের পর মাস বেতন বকেয়া পড়ে থাকে, এবং ন্যূনতম জীবনযাপনের নিশ্চয়তাও থাকে না। অনেক সময় অবসর গ্রহণের পরও তারা আর্থিক অনিশ্চয়তায় জীবন কাটাতে বাধ্য হন, কারণ তাদের জন্য পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা নেই। এর বিপরীতে একই পেশায় নিয়োজিত সরকারি শিক্ষকরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে অনেক বেশি সুরক্ষা ভোগ করেন। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়—এটি একটি পেশাগত অবমূল্যায়ন, যা শিক্ষা খাতে গভীর হতাশা তৈরি করেছে।
২১শ শতাব্দীতে প্রবেশের পর এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বারবার জাতীয়করণের দাবি তুলেছেন, কারণ তারা মনে করেন শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা অপরিহার্য। ২০১০-এর দশকে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লেও প্রতিবারই সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময়ও এই দাবি বারবার উত্থাপিত হলেও সেটি চূড়ান্ত রূপ পায়নি।
বর্তমানে ১৩ আগস্টকে কেন্দ্র করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা আবারও নতুন করে জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের বিশ্বাস, এবার যদি দাবি আদায় না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আন্দোলনের গতি ও প্রভাব অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে, কারণ দীর্ঘদিনের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। একইসাথে রাজনৈতিক অঙ্গনে এ বিষয়টি গুরুত্ব হারালে তা পুনরায় আলোচনার টেবিলে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে আশাংকার জায়গা যেটা তা হল এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এই আন্দোলনে সকল সংগঠন একাত্নতা ঘোষণা করে নাই। অনেক সংগঠন এই আন্দোলনকে অযৌক্তিক ও নানা ধরনের মন্তব্যে বিশেষায়িত করছে যেটি সত্যিই হতাশাজনক।
এই ডেডলাইনের গুরুত্ব শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্ম-প্রেরণা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত না হলে শিক্ষার মান বজায় রাখা কঠিন হবে। যারা আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তাদের যদি বারবার অবমূল্যায়ন ও অবহেলার শিকার হতে হয়, তবে তা জাতীয় উন্নয়নের জন্য হুমকি স্বরূপ।
এখন সময় এসেছে—বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাসের অবসান ঘটিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের। তাদের জাতীয়করণ কেবল একটি পেশাগত দাবি নয়, এটি দেশের শিক্ষা খাতের মানোন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ। তাই বলা যায়—এবারেও যদি আমরা সফল না হই, তাহলে কিন্তু সত্যিই আমরা পিছিয়ে পড়ব।
Leave a Reply