বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে যে নামটি সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে গর্বের, সবচেয়ে আলোচিত—তা নিঃসন্দেহে সাকিব আল হাসান। বিশ্ব ক্রিকেটে অলরাউন্ডার হিসেবে শীর্ষ স্থান দখল করে বারবার প্রমাণ দিয়েছেন, প্রতিভা জন্মায়, কিন্ত গড়ে ওঠে অধ্যবসায়, সাহস আর মানসিক দৃঢ়তায়। হ্যাঁ আমি তার সকল বিষয়কে নিজেও সমর্থন করিনা। তবে তার অর্জনগুলোকে তো আমি ছোট প্রমাণ করতেও পারিনা। তার অর্জনগুলোকে যদি আমি ছোট করতে চাই তাহলে তার চেয়ে বড় অর্জন করে তার পাশাপাশি দাঁড় করান তারপর তার অর্জন এবং তাকে নিয়ে কথা বলুন।
হ্যাঁ তার কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ছিল যেটাকে অনেকে পূঁজি করে তার সমালোচনা করেন। আর সেটা হলো তার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড। কিন্তু একটা সত্য কথা বলেন তো রাজনীতিবিদ হিসাবে তার কর্মকান্ড কতটুকু ছিল। যে কয়েকমাস সে রাজনীতির মন্ডলে যুক্ত ছিল সে কয়েক মাসে সে রাজনীতিবিদ হিসাবে কয়টা স্টেটমেন্ট বা মুভমেন্ট করেছে। এখন যে সকল খেলোয়াড় রাজনীতিবিদ হিসাবে তার সমালোচনায় মুখর তাদের নিজের ও তাদের দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ড সাকিবের চেয়ে কয়েকগুন বেশি।
আপনারা কারা তার অর্জন নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন আপনাদের লজ্জা লাগে না। সাকিবকে নিয়ে কথা বলেন। আপনাদের কার কি যোগ্যতা আছে আমরা তথা এই দেশের মানুষ জানি না। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকেই সাকিব হওয়ার চেষ্টা করছে অর্থ্যাৎ আমি বোঝাতে চাইছি খেলোয়াড় থেকে রাজনীতিবিদ হওয়ার। তার মধ্যে অন্যতম কিছু নাম আপনারা একটু চেষ্টা করলে স্মৃতিতে আনতে পারবেন খুব একটা কষ্ট হবে না। এই লোকগুলো গত ৫ আগষ্ট পরবর্তী নানা সময়ে দেখেছি সাকিবকে কিভাবে ছোট করা যায় সে বিষয়ে নানা সময়ে নানাবিধ কথা বলে নিজেকে আলোচনায় রাখতে। নিজের যোগ্যতায় কিছু করার ক্ষমতা নেই অন্যকে ছোট করে নিজে বড় হওয়ার চেষ্টা করা। সাকিবের এক জীবনের অর্জন আপনার মত লোকেরা হাজার বার জন্ম নিয়েও অর্জন করতে পারবেন না। তাই বলি অন্যকে ছোট করে বড় হওয়ার চেষ্টা না করে নিজে কিছু উল্লেখ করার মত কাজ করুন যাতে এ দেশের মানুষ আপনাকে বড় করে ভাবে।


তবু আশ্চর্যের বিষয়, যতবার সাকিব নতুন কিছু করেন, ইতিহাস গড়েন, দেশের জন্য লড়েন—ঠিক ততবারই কিছু মানুষ বেরিয়ে আসে তাকে ছোট করার তাড়নায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একদল লোক যেন বসেই আছে, কীভাবে সাকিবের ব্যক্তিগত বা পেশাগত কোনো সিদ্ধান্তকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা যায়!
সাকিব আল হাসান—একটি নাম, একটি প্রতীক, বাংলাদেশের ক্রিকেটের গর্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ও কটূক্তি শোনা যাচ্ছে, সেগুলো শুধু তাকে নয়, পুরো দেশের ক্রিকেটপ্রেমী জনগোষ্ঠীকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সাকিবকে রাজাকার, দালাল, চরিত্রহীন, লম্পট—এমনকি খুনি পর্যন্ত বলা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অপবাদ আসলে কী প্রমাণ করে? এগুলো কি তার সাফল্যের প্রতি ঈর্ষা, নাকি একটি সমাজের নিজের অজ্ঞতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ? সাকিব এমনিক কি করেছেন যাতে করে আপনি তাকে দালাল, চরিত্রহীন ও লম্পট বলতে পারেন। হ্যাঁ তার নাম ভাঙ্গিয়ে হয়ত কেউ কেউ দূর্নীতিতে জড়িয়েছেন তাতে সে সরাসরি যুক্ত সে ভাবে কিন্তু প্রমাণিত নয়। হ্যাঁ সে বিষয়ে তার আরও অনেক সচেতন হওয়া উচিত ছিল। সেটা নিয়ে আপনি সমালোচনা করতে পারেন কিন্তু যে ভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছুড়ছেন সেটা অবশ্যই গ্রহণ যোগ্য নয়। আমি বলছি না যে, বিগত আমলে আইনের শাসনের পরিপূর্ণ চর্চা ছিল, যদি সেটা থাকত তাহলে কিন্তু জুলাই বিপ্লবের প্রয়োজন পড়ত না। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের চেতনায় তো এটা ছিল না যে, অযথা কাউকে বা কারও অর্জনকে ছোট করা।



সাকিব সেই খেলোয়াড় যে কিনা সিষ্টেমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে জানে। সাকিব সেই খেলোয়াড় যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কোন সময় যে কোন জায়গায় যে কোন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে জানে। ভুলে গেলেন আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে সাকিব আল হাসানের স্টাম্পে লাথি মারা ও স্টাম্প উপড়ে ফেলার ঘটনা। যদিও সেই ঘটনায় সাকিবের সমালোচনা হয়েছে অনেক। কিন্তু আপনি যদি বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে দেখবেন সেটা ছিল সাকিবের সিষ্টেম পরিবর্তনের একটা প্রতীকী প্রতিবাদ। এভাবে ছাড়া তৎকালীন ফ্যাসিবাদিদের মুখের জবাব দেওয়ার আর কোন ভাষা ছিল। প্রকৃতপক্ষে তার সেই লাথি ছিল ফ্যাসিবাদিদের মুখে লাথি মাড়া। কারণ তখন ঐ বিষয়গুলো ছিল ফ্যাসিবাদিদের বিপক্ষে। যদিও সেটাকে অনেকেই প্রতিবাদের সঠিক ভাষা হিসাবে দেখতে নারাজ তবে সেই সকল সমালোচকরা কোনদিনে সিষ্টেমের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি যা পেরেছিল সাকিব আল হাসান। সাকিবই একমাত্র খেলোয়াড় তৎকালীন ফ্যাসিবাদি সংগঠকদের বিপক্ষে দাঁড়ানোর সাহস করেছিল। ভুলে গেলেনে নিদাহাস ট্রফিত বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষাকারী সেই প্রতিবাদের দৃশ্য। এর আগে এদেশের তথা বিশ্বের কয়টি দেশের কয়টি খেলোয়াড় ওভাবে আইসিসি তথা আয়োজক দেশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। করেছিল কিন্তু এই সাকিব আল হাসান। তার নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করেনি করেছিল বাংলাদেশের স্বার্থের।
সাকিব একজন ক্রীড়াবিদ, একজন কিংবদন্তি অলরাউন্ডার, যিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট কে একটি আন্তর্জাতিক উচ্চতায় তুলে ধরেছেন। তার নেতৃত্ব, প্রতিভা ও মাঠের লড়াই তাকে শুধু একজন সফল খেলোয়াড় নয়, বরং একজন পথপ্রদর্শকে পরিণত করেছে। তিনি মাঠের ভেতরে যেমন দৃঢ়, এবং প্রতিবাদি ছিলেন তেমনি মাঠের বাইরেও একজন দায়িত্বশীল নাগরিক ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি দেশের জন্য যে অবদান রেখেছেন, তা অস্বীকার করার মতো নয়। তবুও তাকে নিয়ে এত বিতর্ক—এর কারণ কী?
অনেকে মনে করেন, সাম্প্রতিক ছাত্র-আন্দোলনের সময় তার নীরবতাই সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশজুড়ে আন্দোলনের সময় তার সোচ্চার ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন অনেক তরুণ। কিন্তু সেই সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পারিবারিক ছবি পোস্ট করায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। অথচ ব্যক্তিগত সময় কাটানো, পরিবারের সঙ্গে থাকা—এসব একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। সাকিব কেবল একজন ক্রিকেটার নন, তিনি একজন বাবা, একজন স্বামীও। তার এই দিকটিও সম্মানের যোগ্য।
মজার বিষয় হলো, যাদের মুখে সাকিবের বিরুদ্ধে এতো সমালোচনা, তারা খুব কমই তার অবদানকে পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্লেষণ করেন। একজন খেলোয়াড় ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, বিশ্বজুড়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন—এই মানুষটির সাময়িক নীরবতা কি তার সব অবদানকে মুছে দিতে পারে? এই প্রশ্নের জবাব খোঁজা জরুরি। মাশরাফি বিন মর্তুজার উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও দায়িত্ব পালন করছেন, অথচ তাকে কেউ এভাবে গালিগালাজ করে না। তাহলে সাকিবের বেলায় এত বৈষম্য কেন? আমি মাশরাফিকে ছোট বা হেয় করিছি না। তারপরেও মাশরাফি যেভাবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিল সেভাবে কিন্তু সাকিব ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা একটা মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক তবে সে পরিচয় যদি সামাজিক ভাবে ঘৃণিত হয় আর সে যদি সেটা জানার পরও তা স্বইচ্ছায় লালন ও পালন করার চেষ্টা করে তাহলে আপনি তাকে অপরাধী ভাবতেই পারেন। তবে এক্ষেত্রে সাকিবকে আপনি কতটুকু দোষী ভাবতে পারেন সেটা একবার নয় বার বার ভাবতে হবে।
এই ঘটনাগুলো আমাদের সমাজের একটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে—আমরা খুব সহজেই আমাদের নায়কদের ছোট করতে পারি, কিন্তু নিজেদের ভুলে যাই। আমাদের সমালোচনার ধরনেই বোঝা যায়, অনেকেই সাকিবের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত। যারা তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছে, তাদের অনেকেই হয়তো জানেই না—দেশের জন্য একজন ক্রীড়াবিদের পরিশ্রম কতটা কঠিন।
সমালোচনা করতেই পারেন, কিন্তু তা যেন হয় তথ্যভিত্তিক, গঠনমূলক ও সম্মানজনক। একজন ব্যক্তিকে শুধুমাত্র মত প্রকাশ না করার কারণে রাজাকার বা খুনি বলাটা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এটা আমাদের অজ্ঞতা এবং অসহিষ্ণুতার প্রমাণ। সাকিবের অর্জন ও অবদানকে অবমূল্যায়ন করার মাধ্যমে আমরা আসলে আমাদের নিজেদের দেশের গর্বকে অপমান করছি।
সুতরাং এখন সময় এসেছে নেতিবাচক সমালোচনার বদলে ইতিবাচক চিন্তার দিকে ফিরে যাওয়ার। সাকিবের মতো একজন আন্তর্জাতিক তারকার অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া আমাদের দায়িত্ব। একজন সাকিব আল হাসান দিনে দিনে জন্মায় না, তাই তাকে ধরে রাখা, তাকে সম্মান করা, এবং তার সাফল্যে গর্বিত হওয়া—এটাই হোক আমাদের সত্যিকারের দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। হ্যাঁ আমি তার যে ভুল ছিল তাকে আমি লালন করার কথা বলছি না। তার যে ভুল ছিল তার জন্য আমরা তার গঠনমুলক সমালোচনা অবশ্যই করব। তেমনি তার অর্জনগুলোকেউ স্বীকৃতি না দেই তাহলে তা ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণাকেউ নষ্ট করবে।
Leave a Reply