প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা : একটি বাস্তব ও বিকল্প রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে দেশের রাজনীতিতে যেমন বিতর্ক রয়েছে, তেমনি বিকল্প পদ্ধতির চিন্তাও ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এমন এক বিকল্প পদ্ধতির নাম পি’আর (PR) পদ্ধতি, অর্থাৎ সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি।
বিশ্বের ৯১টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতিতে নির্বাচন সম্পন্ন করছে। অনেক রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত “First Past the Post” (FPTP) পদ্ধতির তুলনায় PR পদ্ধতি অধিকতর ন্যায়সঙ্গত, প্রতিনিধিত্বশীল এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক ধারা নিশ্চিত করতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন।
কী এই পিআর পদ্ধতি?
উইকিপিডিয়ার ব্যাখ্যায়, আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ভোটারদের রায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট প্রাপ্তির হার অনুযায়ী। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দল যদি ১০% ভোট পায়, তাহলে সংসদে তাদের আসনও হবে প্রায় ১০% হারে।
পিআর পদ্ধতির প্রবর্তন ও বিস্তার
পিআর পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য ও সুবিধাসমূহ:
১. ভোটের অনুপাতে আসন:
PR পদ্ধতিতে প্রতিটি দল তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের শতাংশ অনুযায়ী সংসদীয় আসন পায়।
যেমন –
১% ভোট = ৩ আসন
২% ভোট = ৬ আসন
১০% ভোট = ৩০ আসন
অর্থাৎ, একটি দল যদি ১৫% ভোট পায়, তারা ৪৫টি আসন পাবে।
২. নমিনেশন বাণিজ্যের অবসান:
প্রতিটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনে আগেই তাদের প্রার্থীদের একটি তালিকা জমা দেয়। ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সেই তালিকা অনুযায়ী সাংসদ নির্ধারিত হয়। এতে টাকা-পয়সা, প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ কমে যায়। আমাদের মতো দেশে দলীয় নেতাকর্মীদের দূর্ণীতির হাতে খড়ি শুরু হয় এই নমিনেশন বাণিজের মাধ্যমে। একটি প্রার্থী যখন বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে তার নমিনেশন কনফার্ম করে তখন সাধারণ ভাবে সে তার বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে এটাইতো স্বাভাবিক। সেই ধারাবাহিকতা যদি আপনি রোধ করতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই বর্তমান সিষ্টেমের বাহিরে কিছু চেষ্টা করতে হবে। আর সেই চেষ্টা একটা হতে পারে এই পিআর পদ্ধতির নির্বাচন।
৩.ব্যালট বক্স ছিনতাইয়ে আর জয়লাভ নয়:
ভোট কেন্দ্র দখল করে একজন প্রার্থী জিতে যেতে পারবেন না। কারণ, আসন নির্ধারিত হবে সারাদেশে দলটির প্রাপ্ত মোট ভোটের ভিত্তিতে। তাহলে সেখানে কিছুটা হলেও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দ্বারা ভোট কেন্দ্র দখলের যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে তা থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যাবে।
৪. প্রতিটি ভোট হবে মূল্যবান:
PR পদ্ধতিতে কোনও ভোটই অপচয় হয় না। প্রতিটি ভোট সংসদে প্রতিনিধিত্ব পেতে সহায়ক হয়। ফলে জনগণের ভোটাধিকার আরও বেশি মূল্যবান ও কার্যকর হয়। এই পদ্ধতিতে ১টি ভোটও নষ্ট হওয়ার কোন সুযোগ নাই। যেখানে বর্তমান পদ্ধতিতে কিন্তু ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ভোট অকার্যকর হয়ে পড়ে।
৫. একক আসনভিত্তিক মারামারি কমে যাবে:
যেহেতু সাংসদদের নির্বাচন নির্ধারিত হবে জাতীয় পর্যায়ের ভোটে, তাই স্থানীয়ভাবে প্রভাব খাটিয়ে বা শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন কমে যাবে। এতে সহিংসতা, হানাহানি কমে যেতে পারে।
৬. সীমানা পুনঃনির্ধারণের প্রয়োজন নেই:
পুরো দেশ হবে একটি একক “constituency”। ফলে সীমানা জটিলতা, তর্ক-বিতর্ক, পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের অবসান ঘটবে। ইলেকশন কমিশনের এই জটিল ও সময় সাপেক্ষ বিষয় নিয়ে আর জটিলতা তৈরি হবে না।
৭. উপনির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা কমবে:
কোনও সাংসদ মৃত্যুবরণ করলে বা পদত্যাগ করলে রাজনৈতিক দলের সাবমিট করা তালিকা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যক্তিকে সাংসদ করা যাবে। এতে উপনির্বাচনের সময়, ব্যয় ও জটিলতা কমবে।
৮. প্রবাসীদের জন্য সুবিধাজনক:
যেহেতু জাতীয় পর্যায়ের ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন হবে, তাই প্রবাসীরাও সহজেই অগ্রিম ভোট প্রদান করতে পারবেন। যার ফলে দেশের দেশের উন্নয়নে যারা অন্যতম সহযোগী তাদেরকে আপনি দেশ পরিচালনার নেতৃত্বভার প্রদানেও অংশীদারী করতে পারবেন অনায়াসে।
৯. স্থানীয় সরকার আরও শক্তিশালী হবে:
সাংসদদের স্থানীয় দায়িত্ব না থাকায় উপজেলা পরিষদ ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান অধিক কার্যকর হবে। এমপি ও চেয়ারম্যান দ্বন্দ্বও দূর হবে।
বিদ্যমান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা:
বর্তমানে একজন প্রার্থী হয়তো ৩০-৩৫% ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে যান, যদিও ৬৫-৭০% ভোটার তাকে ভোট দেননি। অর্থাৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের মতামত উপেক্ষিত থাকে। যেমন –
মোট ১০০ ভোটারের মধ্যে:
বিএনপি পায় ৩০ ভোট
জামায়াত ২৫
গণঅধিকার ২০
ইসলামী আন্দোলন ১৫
অন্যান্য ১০
এই অবস্থায় ৭০ জন ভোটার বিএনপিকে ভোট না দিলেও তারাই বিজয়ী হয়। এটাই হলো FPTP পদ্ধতির মৌলিক অসঙ্গতি। অথ্যাৎ সংখ্যাগরিষ্টের মতামত উপেক্ষা করেও আপনি সকলের নেতা নির্বাচিত হলেন।
দুর্বল সংসদ যুক্তির জবাব:
কিছু বিশ্লেষক বলেন, পিআর পদ্ধতিতে সংসদ দুর্বল হয়ে যায়, বলে মতামত প্রকাশ করেন বা সরকার এই পদ্ধতিতে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন যেমন নেপাল বা ইরাকে দেখা যায়। হ্যাঁ সেটা যে একেবারে মিথ্যা তা নয় তবে এর কারণে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জবাবদিহিতা বাড়বে। বর্তমান সিষ্টেমে যেমন একটি সরকারকে ৫ বছরে যত অন্যায় করুক না কেন তাকে কিন্তু আপনি পরিবর্তন করার সম্ভাবনা বা ক্ষমতা নেই বললেই চলে। সেই চিন্তুাধারা থেকে বের হয়ে আসা যাবে। তবে অহেতুক সরকারকে বিপদে ফেলার সম্ভাবনা আমাদের দেশে নেই কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমাদের দেশে জাতিগত, গোত্রীয় বিভাজন নেই। ছোট ছোট দল থাকলেও তারা বড় দলের সাথে জোট করে সরকার গঠন করতে পারে। অতীতে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি — সবাই জোটবদ্ধ হয়েই ক্ষমতায় এসেছে। অতএব, PR পদ্ধতিতে ‘ঝুলন্ত সংসদ’ হওয়ার আশঙ্কা বাস্তবে কম।
রাজনৈতিক সংস্কার ও ভারসাম্য:
PR পদ্ধতির সাথে সাথে যদি রাষ্ট্রপতির কিছু ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কিছু ক্ষমতা হ্রাস করা হয়, তাহলে সরকার ব্যবস্থায় আরও ভারসাম্য আসবে। BNP-এর প্রস্তাবিত দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং জামায়াত, জাতীয় পার্টি, সিভিল সোসাইটি সহ অনেক মহলের প্রস্তাবিত PR পদ্ধতির সমন্বয়ে দেশে একটি নতুন ধারা গড়ে উঠতে পারে।
পি’আর বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি কেবল একটি নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক সংস্কারের হাতিয়ার। এটি নিশ্চিত করে প্রতিটি ভোটারের মূল্যায়ন, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং সুশাসনের ভিত্তি। পাশাপাশি গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর করার একটি বড় মাধ্যম। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও দেশে বিভিন্ন নির্বাচনের বৈষম্যমূলক ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হলে পিআর পদ্ধতির প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply