বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত অনলাইন বদলি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। প্রথমবারের মতো স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম চালু করতে কাজ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এই উদ্যোগের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ৯ম গণবিজ্ঞপ্তির বিষয়টি।
ইতোমধ্যে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) ৯ম শিক্ষক নিয়োগ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অনুমতি চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এতে শিক্ষক সমাজের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—যদি বদলি কার্যক্রম চালুর আগেই ৯ম গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং নিয়োগ সম্পন্ন হয়ে যায়, তাহলে বর্তমানে কর্মরত শিক্ষকরা কি নিজ জেলা বা পছন্দের প্রতিষ্ঠানে বদলির সুযোগ হারাবেন?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, শুধুমাত্র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পেলেই বড় ধরনের কোনো জটিলতা সৃষ্টি হবে না। তবে সমস্যা দেখা দেবে তখনই, যখন বদলি ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার আগেই নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে এবং সংশ্লিষ্ট শূন্য পদগুলোতে সুপারিশ দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেসব পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে, সেগুলো সফটওয়্যারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ বা ‘ব্লক’ হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে ওই পদগুলোতে আর বদলির মাধ্যমে কোনো শিক্ষককে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে না। এতে বহু শিক্ষক, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজ জেলা কিংবা নিজ বাড়ির কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানে বদলির অপেক্ষায় রয়েছেন, তারা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একরকম নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য এই ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন করেছে এবং বর্তমানে তথ্য যাচাই-বাছাই বা ভ্যালিডেশন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই কাজ শেষ হলেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে বদলি আবেদন গ্রহণ শুরু করা সম্ভব হবে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট মাসেই স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের অনলাইন বদলি কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এদিকে ৯ম গণবিজ্ঞপ্তি জুলাই কিংবা আগস্ট মাসে প্রকাশ পেলেও আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই, মেধাতালিকা প্রস্তুত, সুপারিশ এবং যোগদান সম্পন্ন করতে স্বাভাবিকভাবেই কয়েক মাস সময় লাগবে। ফলে এর আগেই যদি বদলি কার্যক্রম শুরু করা যায়, তাহলে স্কুল-কলেজের অধিকাংশ শূন্য পদ বদলির জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এ কারণে এই পর্যায়ের শিক্ষকদের বড় ধরনের জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা কম।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। কারণ এই দুই অধিদপ্তরের জন্য এখনো বদলি সফটওয়্যার প্রস্তুত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের জন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ শুরু হলেও তা শেষ হতে আরও প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের বদলি সফটওয়্যারের কাজ কতদূর এগিয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় সফটওয়্যার তৈরি, পরীক্ষামূলক ব্যবহার, তথ্য যাচাই এবং আবেদন গ্রহণসহ পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম বাস্তবে শুরু হতে আরও অন্তত চার থেকে পাঁচ মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে যদি ৯ম শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যায়, তাহলে ওই সময়ের মধ্যে যেসব শূন্য পদে নতুন শিক্ষক সুপারিশ পাবেন, সেগুলো আর বদলির জন্য ব্যবহার করা যাবে না। ফলে বহু শিক্ষক নিজ বাড়ির কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানে বদলির সুযোগ হারাতে পারেন। বিশেষ করে যারা বহু বছর ধরে দূরবর্তী এলাকায় কর্মরত রয়েছেন, তাদের জন্য বিষয়টি বড় ধরনের হতাশার কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, স্কুল-কলেজের বদলি কার্যক্রম ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। তথ্য সংগ্রহ শেষ হয়েছে এবং যাচাইয়ের কাজও চলছে। কিন্তু মাদ্রাসা ও কারিগরি খাতে সেই অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। কেন এই বিলম্ব হচ্ছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর কাছ থেকেও এখনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অপরদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খুব দ্রুত বদলি সফটওয়্যার তৈরির কার্যক্রম শুরু করা হবে। সফটওয়্যার প্রস্তুত হয়ে গেলে বদলি কার্যক্রম চালু করতে আর উল্লেখযোগ্য কোনো বাধা থাকবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বদলি ব্যবস্থা ও নতুন শিক্ষক নিয়োগ—দুই কার্যক্রমের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় করা না গেলে বিশেষ করে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষকদের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই বদলি কার্যক্রম দ্রুত চালু করা কিংবা প্রয়োজন হলে নিয়োগ কার্যক্রমের সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি এখন শিক্ষা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Leave a Reply