নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের কার্যক্রম এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এ-সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি ধারাবাহিকভাবে সুপারিশমালা প্রস্তুতের কাজ চালিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং সংশ্লিষ্ট সবাই নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষায় রয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চললেও এখনো নির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না, গেজেট আগামী আগস্ট মাসে প্রকাশ করা সম্ভব হবে, নাকি বাস্তবায়নের আগে আরও কিছু সময় প্রয়োজন হবে এবং সেটি অক্টোবর পর্যন্ত গড়াতে পারে। এ অনিশ্চয়তা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, শুরুতে নবম জাতীয় পে স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। সেই প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর করা, দ্বিতীয় ধাপে অবশিষ্ট মূল বেতন যুক্ত করা এবং তৃতীয় ধাপে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা কার্যকর করার প্রস্তাব ছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে আর্থিক বিশ্লেষণ ও বেতন কাঠামোর হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে প্রত্যাশিত হারে বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বেতনের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উঠে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধাপে ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে ইনক্রিমেন্ট গণনা, গ্রেডভিত্তিক পার্থক্য এবং আর্থিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে পরে দুই ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের একটি বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সেই প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বর্তমানে সচিব কমিটি আবারও নতুন একটি তিন ধাপের বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে।
বর্তমান আলোচনায় যে কাঠামোটি গুরুত্ব পাচ্ছে, তাতে প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ধরনের ভাতা যুক্ত করা এবং তৃতীয় ধাপে অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ও সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ প্রস্তাবও এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আরও আলোচনা চলছে।
গত ১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে সম্ভাব্য বাস্তবায়ন পদ্ধতি, সরকারের ওপর আর্থিক চাপ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, আইবাস (IBAS++) ও সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার কাঠামোর সক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত অন্যান্য জটিলতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তবে ওই বৈঠক থেকেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সচিব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সময় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি এবং নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সূত্রের দাবি, মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে আইএমএফ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য বা লিখিত মন্তব্য প্রকাশ করেনি।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট বরাদ্দের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এছাড়া জনপ্রশাসন খাতের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দও রাখা হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকলেও এখনো গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দূর হয়নি। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলছেন, বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যমান বেতন দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে তারা দ্রুত নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি এবং বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছেন।
অপরদিকে সচিব কমিটির সদস্যরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত একটি জাতীয় বেতন কাঠামো প্রণয়ন করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। সে কারণে তাড়াহুড়া করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সব দিক বিবেচনা করে একটি ত্রুটিমুক্ত সুপারিশমালা চূড়ান্ত করতে তারা আরও কয়েকটি বৈঠক করতে পারেন। তাদের মতে, ভবিষ্যতে যাতে নতুন করে সংশোধনের প্রয়োজন না হয়, সে বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগলেও কার্যকর হওয়ার তারিখ পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই। সরকারের বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হলে সেটি ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকেই কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ গেজেট পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় বেতন কমিশন তাদের সুপারিশে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি এবং সরকারের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নিয়ে সেই সুপারিশে কিছু পরিবর্তন এনে একটি সংশোধিত ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ এখনো চলমান রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ এবং বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
Leave a Reply