ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি এবং আধুনিক ক্রিকেটের পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডারের প্রতীক স্যার গারফিল্ড “গ্যারি” সোবার্স আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুতে বিশ্ব ক্রিকেটে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—ক্রিকেটের প্রতিটি বিভাগে অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্য তিনি সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন হিসেবে স্বীকৃত। বহু ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সাবেক খেলোয়াড়ের মতে, ক্রিকেট ইতিহাসে তার মতো বহুমাত্রিক প্রতিভার অলরাউন্ডার খুব কমই দেখা গেছে।
স্যার গ্যারি সোবার্সের প্রয়াণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট বোর্ড, সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটার, ভক্ত-সমর্থক এবং ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ক্রিকেটে তার রেখে যাওয়া অবদান আজও অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রয়াত কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার ও সাবেক অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক রিচি বেনো একবার তাকে “বিশ্ব ক্রিকেটে দেখা সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার” বলে অভিহিত করেছিলেন। বেনোর মতে, সোবার্স শুধু একজন অসাধারণ ব্যাটসম্যানই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ফিল্ডার এবং এমন এক বিরল প্রতিভাধর বোলার, যিনি নতুন বল হাতে পেস বোলিং, বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন এবং বাঁহাতি রিস্ট স্পিন—সব ধরনের বোলিংয়েই সমান দক্ষতা দেখাতে পারতেন।
১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই ক্যারিবীয় দ্বীপ বার্বাডোসে জন্মগ্রহণ করেন গ্যারি সোবার্স। খুব অল্প বয়স থেকেই ক্রিকেটে তার অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় মিলতে শুরু করে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন। ১৯৫৩ সালে বার্বাডোসের হয়ে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে মাঠে নামার পর অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাচকদের নজর কাড়েন। তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে ১৯৫৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে টেস্ট অভিষেকের সুযোগ পান। সেই থেকেই শুরু হয় এক কিংবদন্তি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিতে তাকে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে জ্যামাইকার কিংস্টনে তিনি খেলেন ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় একটি ইনিংস। ওই ম্যাচে অপরাজিত ৩৬৫ রান করে তিনি টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন। সেই সময়ে এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য অর্জন। তার এই রেকর্ড টানা প্রায় ৩৬ বছর অক্ষুণ্ন ছিল। অবশেষে ১৯৯৪ সালে আরেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা ৩৭৫ রান করে সেই রেকর্ড ভেঙে দেন।
স্যার গ্যারি সোবার্সের ক্যারিয়ারের আরেকটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসে ১৯৬৮ সালে। ইংল্যান্ডের ওয়েলসের সোয়ানসির সেন্ট হেলেন্স মাঠে গ্ল্যামরগানের বিপক্ষে প্রথম-শ্রেণির এক ম্যাচে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। প্রতিপক্ষ বোলারের এক ওভারের ছয়টি বলেই ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে বিস্মিত করে দেন। স্বীকৃত ক্রিকেটে এক ওভারে ছয় বলে ছয় ছক্কার এটিই ছিল প্রথম ঘটনা। আজও ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ও আলোচিত কীর্তি হিসেবে এই অর্জনের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে গ্যারি সোবার্স ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। ৫৭.৭৮ গড়ে করেছেন ৮ হাজার ৩২ রান, যার মধ্যে রয়েছে ২৬টি শতক ও ৩০টি অর্ধশতক। বল হাতেও ছিলেন সমান কার্যকর। ক্যারিয়ারে নিয়েছেন ২৩৫টি টেস্ট উইকেট। পাশাপাশি অসাধারণ ফিল্ডিং দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে নিয়েছেন অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ। পাঁচ হাজারের বেশি টেস্ট রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তার ব্যাটিং গড় এখনও ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই নয়, প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটেও তার পরিসংখ্যান বিস্ময়কর। ৩৮৩টি প্রথম-শ্রেণির ম্যাচে তিনি ২৮ হাজারের বেশি রান সংগ্রহ করেন এবং বল হাতে শিকার করেন এক হাজারেরও বেশি উইকেট। ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই এমন অসাধারণ সাফল্য তাকে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডারে পরিণত করেছে। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সাউথ অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ারের হয়েও খেলেছেন এবং সেখানেও নিজের অসাধারণ নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।
১৯৭৪ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান স্যার গ্যারি সোবার্স। অবসরের পর তার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরের বছর বিখ্যাত ক্রিকেট সাময়িকী উইজডেন মন্তব্য করেছিল, দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিই তাকে অবসরের পথে ঠেলে দেয়। হাঁটুর চোট থাকলেও সেটিই ছিল না একমাত্র কারণ। দীর্ঘ সময় ধরে টানা আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা, অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিটি ম্যাচে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়মিত সফরের চাপ তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে কঠিন করে তুলেছিল।
ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। এরপর থেকেই তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হন ‘স্যার গ্যারি সোবার্স’ নামে। তার ক্রিকেট দর্শন, বহুমুখী দক্ষতা এবং অসাধারণ অর্জন পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য ক্রিকেটারের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ অলরাউন্ডাররা তাকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করেন।
স্যার গ্যারি সোবার্সের মৃত্যু শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের জন্য নয়, গোটা ক্রিকেট বিশ্বের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার অসাধারণ ব্যাটিং, কার্যকর বোলিং, দুর্দান্ত ফিল্ডিং এবং খেলাটির প্রতি নিবেদন ক্রিকেট ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বিদায় নিলেও তার গড়ে যাওয়া রেকর্ড, অনন্য কীর্তি এবং ক্রিকেটে রেখে যাওয়া অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমানভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
Leave a Reply