আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে অর্থ বিভাগ। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন বেতন কাঠামো চালুর প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং চলতি মাস থেকেই এটি পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থানও রাখা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন একবারে হবে নাকি একাধিক ধাপে কার্যকর করা হবে—এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সচিব পর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ধাপ ও সময়সূচি নির্ধারণ করবে মন্ত্রিপরিষদ। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আদায়ের অবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৈঠকে উপস্থিত অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন পে-স্কেল নিয়ে আইএমএফ কোনো ধরনের আপত্তি বা সুপারিশ দেয়নি। বরং তারা জানতে চেয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে জাতীয় বাজেট, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে আইএমএফ প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের আওতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অঙ্কটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় খুব বেশি বৃদ্ধি না পেলেও অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য বাজেটের অন্য খাতগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাজেটের ‘পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের সম্পদের ব্যবহার’ অংশে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের পরিমাণ ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, এই অতিরিক্ত অর্থের মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা এবং পেনশনভোগীদের ব্যয় নির্বাহের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পুরো পে-স্কেল একযোগে বাস্তবায়নের পরিবর্তে দুই অর্থবছরে সর্বোচ্চ তিন ধাপে এটি কার্যকর করার একটি প্রস্তাব বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে চলতি অর্থবছরেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে আগামী অর্থবছরের শুরুতে বাড়িভাড়া ভাতা সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর একই অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে, অর্থাৎ আগামী বছরের জানুয়ারি মাস থেকে চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতা নতুন হারে কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে সচিব কমিটির আলোচনায় নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গ্রেডভিত্তিক ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। আলোচনায় উঠে এসেছে, গ্রেড ১১ থেকে ২০-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ও ভাতা তুলনামূলক বেশি হারে বৃদ্ধি করা হতে পারে। অন্যদিকে গ্রেড ১ থেকে ১০-এর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হারে বৃদ্ধি দেওয়ার সুপারিশ বিবেচনায় রয়েছে। এর পেছনে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের আয় বৈষম্য কমানোর যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
এর আগে নবম জাতীয় পে-স্কেল প্রণয়নের জন্য গঠিত পে-কমিশনের সুপারিশে বিভিন্ন গ্রেডে বেতন ও ভাতা সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব ছিল। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় সেই সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ফলে বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজও সম্পন্ন করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার হালনাগাদ, হিসাবরক্ষণ পদ্ধতির সমন্বয়, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন পুনর্নির্ধারণ, বিভিন্ন ভাতার নতুন হার সংযোজন এবং বেতন সমন্বয়ের প্রযুক্তিগত কার্যক্রম। এসব বিষয় সম্পন্ন না হলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এসব কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি করে নতুন জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের লক্ষ্যে সচিব কমিটি ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট জারি করে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে পারে।
Leave a Reply