সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে প্রজ্ঞাপনের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এ উদ্দেশ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও পর্যালোচনার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি ধাপ সম্পন্ন করতে হচ্ছে। প্রথম ধাপে বেতন কমিশন এবং সচিব কমিটির সুপারিশ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের ওপর কী পরিমাণ অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়বে, তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করছে। এই মূল্যায়ন শেষে বিষয়টি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যেখানে প্রয়োজনীয় আইনি যাচাই-বাছাই (ভেটিং) সম্পন্ন হওয়ার পর সরকারি গেজেট আকারে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
সরকারের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী নবম জাতীয় পে-স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা ছিল। তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আর্থিক বিশ্লেষণ, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হওয়ায় চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূর্ববর্তী সরকারের প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো হুবহু বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজস্ব আদায়ে চাপ, বাজেট ঘাটতি, দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান দায় এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নতুন করে ভারসাম্য আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে প্রস্তাবিত পে-স্কেলের বিভিন্ন অংশ পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ কারণে বিভিন্ন গ্রেডের মূল বেতন, বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার কাঠামো নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকার এমন একটি কাঠামো চূড়ান্ত করতে চায়, যাতে একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধি থেকে উপকৃত হন, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়।
তবে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো, চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন যেদিনই প্রকাশ করা হোক না কেন, নবম জাতীয় পে-স্কেল ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ গেজেট প্রকাশের পর ওই তারিখ থেকে প্রাপ্য বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সমন্বয় করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিশোধ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন একবারে না করে দুই অর্থবছরে সর্বোচ্চ তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিক পর্যায়ে চলতি অর্থবছরেই মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। এরপর আগামী অর্থবছরের শুরুতে বাড়িভাড়া ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে, অর্থাৎ আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা কার্যকর করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটির আলোচনায় গ্রেড ১১ থেকে ২০-এর কর্মচারীদের মূল বেতন ও ভাতা তুলনামূলক বেশি হারে বৃদ্ধির সুপারিশ গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রেড ১ থেকে ১০-এর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হারে বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে বেতন কমিশনের সুপারিশে বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব ছিল। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
এদিকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার হালনাগাদ, হিসাবরক্ষণ পদ্ধতির সমন্বয়, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন পুনর্নির্ধারণ, বেতন পুনর্নির্ধারণ (ফিক্সেশন) এবং বিভিন্ন আর্থিক হিসাব সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে হচ্ছে। এসব কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত সমাধান করে যত দ্রুত সম্ভব নবম জাতীয় পে-স্কেলের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের লক্ষ্যে সচিব কমিটি কাজ করে যাচ্ছে।
সুত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
Leave a Reply