আগামীকাল রোববার পাঁচ দিনের সফরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসছে। সফরকালে নতুন ঋণ কর্মসূচি, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি, রাজস্ব আহরণ, বাজেট সহায়তা এবং সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করবে সংস্থাটি। তবে এবারের সফরে সরকারের ঘোষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়েও আইএমএফের আগ্রহ প্রকাশ পাওয়ায় নতুন করে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার ভূমিকা কতটুকু হওয়া উচিত?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফ প্রতিনিধিদল অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবে। এসব বৈঠকে নতুন ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব পরিস্থিতি এবং নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থায়ন নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নবম জাতীয় পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। চলতি অর্থবছরেই প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে কয়েক দশ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। ফলে সরকারের এই ব্যয় সামষ্টিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে এবং অর্থায়নের উৎস কী হবে—সেটি জানতে আগ্রহী আইএমএফ।
এখানেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। অনেকের প্রশ্ন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ, সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা রাষ্ট্রীয় আর্থিক অগ্রাধিকারের মতো বিষয় কি কেবল বাংলাদেশের নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়? যদি এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোনো ঋণদাতা সংস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বা মতামত দেয়, তাহলে রাষ্ট্রের নীতিগত স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ন থাকে—সে প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, আইএমএফ কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখে না। তবে ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শর্ত, সংস্কার পরিকল্পনা এবং আর্থিক লক্ষ্য পূরণের বিষয়টি তারা মূল্যায়ন করে থাকে। একটি দেশ যখন আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে, তখন নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজস্ব বৃদ্ধি, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কিংবা আর্থিক শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কিছু প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করাই সংস্থাটির মূল দায়িত্ব।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, আইএমএফ উন্নয়ন সহযোগী হলেও তারা অনুদান দেয় না; বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে ঋণ নেয়, যা সুদসহ পরিশোধ করতে হয়। ফলে অনেকের মতে, ঋণদাতা হিসেবে আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা স্বাভাবিক হলেও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা যেন কোনোভাবেই নীতিগত নির্ভরশীলতায় পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
আবার অন্য একটি মত হলো, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় সব দেশই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে চলে। ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে শর্ত, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং নীতিগত আলোচনা আন্তর্জাতিক অর্থায়নের একটি প্রচলিত অংশ। ফলে এটি সার্বভৌমত্ব হারানোর বিষয় নয়; বরং ঋণচুক্তির আওতায় পারস্পরিক দায়বদ্ধতার একটি প্রক্রিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল প্রশ্নটি আইএমএফের উপস্থিতি নয়; বরং বাংলাদেশ কতটা স্বাধীনভাবে নিজের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারছে এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে দরকষাকষি করতে পারছে। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক ঋণনির্ভরতাও তত কমবে এবং নীতিগত স্বাধীনতাও তত বেশি সুসংহত হবে।
সব মিলিয়ে, আইএমএফ প্রতিনিধিদলের এবারের সফর শুধু নতুন ঋণ কর্মসূচি বা পে-স্কেলের অর্থায়ন নিয়েই নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
সম্পাদনা নোট: এই প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণধর্মীভাবে লেখা হয়েছে। এতে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়েছে—কোনো একটি মতকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
Leave a Reply