বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘদিন পর নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে একই বেতন কাঠামোতে চাকরি করা সরকারি কর্মচারীদের জন্য এটি স্বস্তির খবর হলেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে।
একদিকে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, আয় বৈষম্য, বাজারদর এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিনের মতো অনেক বেসরকারি চাকরিজীবী মনে করছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
তার মতে, বর্তমানে যে বেতন পান, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানোই কঠিন। বাজারে প্রতিদিনই নতুন দামের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বৃদ্ধি পেলে ব্যবসায়ীরা সেটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন। অথচ বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় একই অবস্থায় থেকে যাবে।
এই ধরনের উদ্বেগ শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণেও প্রতিফলিত হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতি বছর নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
পূর্ববর্তী সরকারের সময় একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণ করে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করে।
সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা বৃদ্ধি, যাতায়াত ভাতা পুনর্নির্ধারণসহ বিভিন্ন সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়।
তবে এত বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নে বিপুল অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে বলে কমিশন উল্লেখ করে।
বর্তমান সরকার আগের কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটি নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া তৈরি করেছে।
জানা গেছে, নতুন খসড়ায় বিশেষভাবে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। কিছু গ্রেডে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো বেতন কাঠামো একবারে কার্যকর না করে কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে, যাতে অর্থনীতির ওপর চাপ কিছুটা কম থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক উচ্চ অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ অর্থনীতিতে প্রবেশ করলে চাহিদা বাড়তে পারে, যার প্রভাব বাজারদরে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে যদি ঋণ গ্রহণ বা নতুন অর্থ সরবরাহ বাড়াতে হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বেতন বৃদ্ধি পেলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। ফলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার চাহিদাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
যদি সেই অনুপাতে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন।
তাই অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি বাজার তদারকি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।
বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির বিশাল অংশ বেসরকারি খাতে কর্মরত। সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও যদি বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় একই অবস্থায় থাকে, তাহলে দুই খাতের আয়ের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায়, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে যাদের আয় স্থির, তাদের জন্য খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে দারিদ্র্য কমানোর পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে।
এই অর্থের একটি অংশ সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে ব্যয় হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে সরকারকে দেশীয় বা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। দেশীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে তারল্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকার বলছে, সরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘ সময় ধরে একই বেতন কাঠামোতে কাজ করছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।
তবে অর্থনীতির ওপর একসঙ্গে অতিরিক্ত চাপ এড়াতে সরকার ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। প্রথম ধাপে মূল বেতন সমন্বয় এবং পরবর্তী ধাপে অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
নতুন পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক স্বস্তি এনে দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতের মজুরি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেতন বৃদ্ধি সফল করতে হলে শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ালেই হবে না; বাজার নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই নতুন পে-স্কেলের সুফল অর্থনীতির বৃহত্তর অংশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
Leave a Reply