সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে গত ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট এখনো প্রকাশিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পে-স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও গেজেট প্রকাশের আগে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে তিনটি পৃথক পে-কমিশনের সুপারিশ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে এই খসড়াকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য চলতি সপ্তাহেই পে-কমিশনের সুপারিশ পুনর্মূল্যায়নে গঠিত সচিব কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্তের ওপরই মূলত নির্ভর করছে নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত রূপ।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় সচিব কমিটির বৈঠকেই নবম পে-স্কেলের বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। সেখানে তিনটি পৃথক পে-কমিশনের সুপারিশের মধ্যে যেসব বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত বাকি রয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করা হবে।
বৈঠক শেষে সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় সেই সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠাবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পরই নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর প্রয়োজন হলে একটি ভেটিং প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হতে পারে। এই ভেটিংয়ের মাধ্যমে গেজেটের আইনগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন করা হবে। সব ধাপ সফলভাবে শেষ হওয়ার পরই সরকার আনুষ্ঠানিক গেজেট জারি করবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সচিব কমিটি ইতোমধ্যেই তিনটি পৃথক কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে একটি নীতিগত খসড়া প্রস্তুত করেছে। তবে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর আগে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, এই বৈঠকে বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনী—এই তিনটি পৃথক খাতের জন্য প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হবে। এরপরই সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যাতে পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝিতেই নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হতে পারে।
তিনি বলেন, যদি কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি জটিলতা তৈরি না হয়, তাহলে জুলাইয়ের মাঝামাঝি গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। আর কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে পরবর্তী সপ্তাহের মধ্যেই গেজেট জারি করা হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক জানিয়েছেন, সচিব পর্যায়ের সুপারিশ কমিটি চলতি সপ্তাহেই তাদের চূড়ান্ত সভা করতে পারে।
তিনি বলেন, গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কারণ সরকার ইতোমধ্যেই ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশ দুই-তিন মাস পিছিয়ে গেলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে প্রাপ্য সকল বেতন-ভাতা ও বকেয়া একসঙ্গেই পাবেন।
তার ভাষায়, “গেজেট প্রকাশে যদি কিছুটা দেরিও হয়, দুই-তিন মাস সময়ও যদি লাগে, তবুও ১ জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হলে আমরা বকেয়াসহ সব সুবিধা পাব। সে ক্ষেত্রে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে আমরা চাই, যত দ্রুত সম্ভব গেজেট প্রকাশ করা হোক। এতে সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও একটি স্বস্তি ফিরে আসবে।”
নবম জাতীয় পে-স্কেল প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়। সে সময় পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য একটি সচিব কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যেখানে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও অর্থ সচিবসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ওই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারের নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘প্রশাসনিক পর্যালোচনা কমিটি’ বা সচিব কমিটি কাজ করছে।
এই নতুন কমিটি আগের কমিটির তৈরি করা খসড়া সুপারিশগুলো বর্তমান রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনরায় মূল্যায়ন করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সচিব কমিটি মূলত একটি কারিগরি বা টেকনিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যস্ফীতির হিসাব বিবেচনা করে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব তৈরি করেছিল।
কিন্তু বর্তমান সরকার সেই প্রস্তাব পুনর্মূল্যায়নের সময় শুধু অর্থনৈতিক বাস্তবতাই নয়, নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে নতুন সুপারিশে কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার—দুই বিষয়ই প্রতিফলিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শুরুর দিকে নবম জাতীয় পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে পে-স্কেলের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত সচিব কমিটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন দুই ধাপে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা আইবিএএসপ্লাস (iBAS++)-এ অতিরিক্ত জটিলতা এড়াতে অর্থ বিভাগ একবারেই নতুন মূল বেতন কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছে।
সে অনুযায়ী সচিব কমিটি পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে দুই ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে অর্থাৎ চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শতভাগ নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে।
আর দ্বিতীয় ধাপে, অর্থাৎ ২০২৭-২০২৮ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা, সুবিধা এবং অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধির বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হতে পারে।
ফলে সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত নতুন বেতন কার্যকর করা এবং পরবর্তী ধাপে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাগুলো সমন্বয় করে পূর্ণাঙ্গ নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা।
Leave a Reply