প্রতি বছরের মতো এবারও জুলাই মাস এলেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে—বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট। ২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিতভাবে প্রতি বছর জুলাই মাসে বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি পেয়ে আসছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকেও তাদের ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার কথা। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ একই সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। আর এখানেই তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও সংশয়।
স্বাভাবিকভাবেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও সরকারি বেতন কাঠামোর আওতাভুক্ত। তাই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে তারাও সেই সুবিধা পাবেন—এমন প্রত্যাশাই সবার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট কীভাবে গণনা হবে? এটি কি নতুন বেতন কাঠামোর ভিত্তিতে যোগ হবে, নাকি পুরোনো বেতন কাঠামোর ভিত্তিতেই কার্যকর হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছেন। কারণ অতীতের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে অনেকের মধ্যেই একটি আশঙ্কা কাজ করে যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রশাসনিক জটিলতা বা ব্যাখ্যার কারণে সুবিধা পেতে বিলম্ব হয় কিংবা অপ্রত্যাশিত জটিলতার সৃষ্টি হয়। ফলে এবারও অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইছেন, ইনক্রিমেন্ট আদৌ যুক্ত হবে কি না।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জানিয়েছেন যে ইনক্রিমেন্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই জুলাই মাস থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হবে। অর্থাৎ নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।
তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। যদি সরকার জুলাই মাস থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করে, তাহলে কি ইনক্রিমেন্ট নতুন মূল বেতনের ওপর যোগ হবে? নাকি পুরোনো মূল বেতনের ওপর ইনক্রিমেন্ট যোগ করে পরে নতুন পে-স্কেলে সমন্বয় করা হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ইতোমধ্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলতি বছরের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট পুরোনো বেতন কাঠামোর ভিত্তিতেই কার্যকর করা হয়েছে। কারণ নতুন পে-স্কেলের গেজেট ও বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। ফলে জুলাই মাসে তারা বিদ্যমান বা পুরোনো বেতন কাঠামো অনুসারেই ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন।
সেই বাস্তবতা বিবেচনায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ প্রথমে পুরোনো বেতন কাঠামোর আওতায় বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট যোগ হবে। এরপর সরকার যখন নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করবে এবং সেটি কার্যকর হবে, তখন নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
এটি শুধু যৌক্তিকই নয়, প্রশাসনিকভাবেও সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি। কারণ একই সময়ে দুটি ভিন্ন বেতন কাঠামোর আওতায় ইনক্রিমেন্ট হিসাব করা হলে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পুরোনো কাঠামোয় ইনক্রিমেন্ট প্রদান করে পরে নতুন পে-স্কেলে রূপান্তর করাই সাধারণত সরকারি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। নতুন পে-স্কেল কার্যকর মানেই পুরোনো ইনক্রিমেন্ট বাতিল হয়ে যাবে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট একটি স্বীকৃত চাকরিগত অধিকার, যা নির্ধারিত সময় পূরণ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারী পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে নতুন পে-স্কেল হলো সামগ্রিক বেতন কাঠামোর পুনর্নির্ধারণ। ফলে একটি আরেকটির বিকল্প নয়; বরং উভয় সুবিধাই বিধি অনুযায়ী কার্যকর হওয়ার কথা।
তবে চূড়ান্ত বিষয়টি নির্ভর করবে সরকারের প্রকাশিত গেজেট, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়ন পরিপত্রের ওপর। সেখানে যদি বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়, তাহলে সেই অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে অনুসৃত প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ইনক্রিমেন্ট পুরোনো বেতন কাঠামোর ভিত্তিতেই যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে মনে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। অতীতের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী জুলাই মাসের ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সেটিও বিধি অনুযায়ী পরবর্তীতে সমন্বয় করা হবে। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারের চূড়ান্ত গেজেট এবং বাস্তবায়ন নির্দেশনার অপেক্ষা করা।
শিক্ষক-কর্মচারীদেরও উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত গুজব বা যাচাইবিহীন তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা। সরকার যখন নতুন বেতন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করবে, তখনই ইনক্রিমেন্ট, বেতন নির্ধারণ এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সম্পর্কে সব ধরনের সংশয় দূর হয়ে যাবে।
Leave a Reply