আর মাত্র ছয় মাস পরই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত তারকা ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে ঘিরে শুরু হতে পারে বড় ধরনের ট্রান্সফার আলোচনা। কারণ, রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকলেও নতুন চুক্তি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। দুই পক্ষই চুক্তি নবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত সেটি কাগজে-কলমে চূড়ান্ত না হওয়ায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নিয়ম অনুযায়ী তিনি অন্য যেকোনো ক্লাবের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করার সুযোগ পাবেন। ফলে সময় যত এগোচ্ছে, ততই এই ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গারের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা বাড়ছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ প্রকাশ্যে কোনো ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করছে না। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। বরং ক্লাবের পক্ষ থেকে সবাইকে ধৈর্য ধরার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। রিয়াল মাদ্রিদ ও ভিনিসিয়াস—দুই পক্ষই পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, চলমান বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগে নতুন চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হবে না। ক্লাব চায় না, গুরুত্বপূর্ণ এই টুর্নামেন্ট চলাকালে চুক্তি সংক্রান্ত বিষয় ভিনিসিয়াসের মনোযোগে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলুক। তাই বিশ্বকাপ শেষে আলোচনার টেবিলে বসেই চুক্তি নবায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। ব্রাজিলের আক্রমণভাগে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই টুর্নামেন্টে তার অসাধারণ নৈপুণ্য নতুন চুক্তির আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য এখনো অর্থনৈতিক বিষয়েই রয়ে গেছে।
বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদে ভিনিসিয়াসের বার্ষিক পারিশ্রমিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ইউরো। কিন্তু নতুন চুক্তিতে তিনি বছরে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ইউরো বেতন প্রত্যাশা করছেন। অর্থাৎ বর্তমান পারিশ্রমিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি চান এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। তবে রিয়াল মাদ্রিদ শেষ পর্যন্ত এই দাবি মেনে নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। যদিও বিশ্বকাপে তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করেছে, তিনি এমন একজন ফুটবলার যিনি একাই ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। ফলে পারিশ্রমিক নিয়ে তার অবস্থানও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত ৭ জুন রিয়াল মাদ্রিদের নির্বাচন উপলক্ষে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজও ভিনিসিয়াসের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ভিনিসিয়াস এই ক্লাবেই থাকতে চায় এবং আমিও চাই সে রিয়াল মাদ্রিদেই থাকুক।” সভাপতির এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়, ক্লাবের শীর্ষ পর্যায়ও ভিনিসিয়াসকে দীর্ঘমেয়াদে দলে রাখতে আগ্রহী।
এর কয়েক দিন পর, ১২ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে ভিনিসিয়াস নিজেও একই ধরনের ইঙ্গিত দেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, আপাতত তার পুরো মনোযোগ বিশ্বকাপেই। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমি সম্পূর্ণভাবে জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনেই মনোযোগ দিচ্ছি। রিয়াল মাদ্রিদ সংক্রান্ত সব বিষয়ে আমি বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর কথা বলব। এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য আমার দেশের হয়ে ভালো খেলা, সতীর্থদের সঙ্গে সফল একটি টুর্নামেন্ট উপহার দেওয়া।”
বিশ্বকাপে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ইতোমধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ ক্লাবের নজর কেড়েছে। ব্রাজিলের হয়ে প্রথম তিনটি ম্যাচে তিনি তিনটি গোল করার পাশাপাশি দুটি অ্যাসিস্টও করেছেন। তার এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে আবারও ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে আলোচনার ঝড় উঠলেও এখন পর্যন্ত অন্য কোনো ক্লাবের পক্ষ থেকে ভিনিসিয়াসের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব পৌঁছায়নি।
এর আগে সৌদি আরবের কয়েকটি ক্লাব তাকে দলে ভেড়ানোর বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছিল। সে সময় রেকর্ড পরিমাণ অর্থের প্রস্তাব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমানে সেই আগ্রহ অনেকটাই কমে এসেছে। বিভিন্ন সূত্রের ধারণা, সৌদি ক্লাবগুলোর আগ্রহের বিষয়টি মূলত খেলোয়াড়পক্ষের আলোচনায় চাপ সৃষ্টি করার একটি কৌশল হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছিল।
অন্যদিকে কয়েক মাস আগে ইংলিশ ক্লাব চেলসিও ভিনিসিয়াসকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সম্ভাবনাও অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে চেলসির বর্তমান কোচ জাবি আলোনসোর সঙ্গে ভিনিসিয়াসের সম্পর্কের অবনতি। জানা যায়, বার্নাব্যুতে একসঙ্গে কাজ করার সময় এক এল ক্লাসিকো ম্যাচে ভিনিসিয়াসকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দুজনের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে তাদের সম্পর্ক আর আগের মতো স্বাভাবিক নেই বলেই বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। রিয়াল মাদ্রিদ এবং খেলোয়াড়—উভয় পক্ষই একসঙ্গে পথচলা অব্যাহত রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও নতুন চুক্তিতে এখনো আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হয়নি। ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, ততই আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থানে চলে যাচ্ছেন এই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরই চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে তার রিয়াল অধ্যায় আরও দীর্ঘায়িত হবে, নাকি নতুন কোনো নাটকীয় মোড় নিয়ে অন্য কোনো ক্লাবের সঙ্গে ভবিষ্যতের আলোচনা শুরু হবে—সেই উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই।
Leave a Reply