এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন ও ঈদুল আজহার উৎসব ভাতার বিল সাবমিটকে কেন্দ্র করে আবারও চরম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন হাজারো শিক্ষক। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) প্রতি বছরই বেতন-ভাতা প্রদানকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে, আর এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আজ ১২ মে বিকাল পর্যন্তও মে মাসের বেতন ও উৎসব ভাতার বিল সাবমিটের অপশন পুরোপুরি চালু করতে পারেনি মাউশি। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো হয়েছে আগামী ১৩ মে’র মধ্যেই বিল সাবমিট সম্পন্ন করতে হবে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একদিনেরও কম সময়ে দেশের হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিল প্রস্তুত, যাচাই ও সাবমিট করবে?
শিক্ষকরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির ধারাবাহিকতা। কারণ, বিল সাবমিটের সময়সীমা নির্ধারণের আগে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও সার্ভার প্রস্তুত রাখা মাউশির দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নির্ধারিত সময় চলে এলেও সিস্টেম সচল করা যায়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন ইএমআইএস সার্ভারে প্রবেশ করতে পারছে না। কেউ লগইন করতে পারলেও বিল সেভ বা সংরক্ষণ অপশন দেখাচ্ছে না। এতে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষকদের একাংশের দাবি, পুরো পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। কারণ, ঈদের আগে মে মাসের বেতন ও উৎসব ভাতা একসঙ্গে দিতে হলে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ ছাড় করতে হবে। কিন্তু বিল সাবমিটে বিলম্ব হলে পরবর্তীতে খুব সহজেই বলা যাবে—“কারিগরি সমস্যার কারণে সময়মতো বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি।” সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত হয়তো মাউশি কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুঃখ প্রকাশ করে দায় এড়িয়ে যাবে, কিন্তু ভোগান্তির শিকার হবেন শিক্ষক-কর্মচারীরাই।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাউশি আগেই জানত যে ঈদ সামনে এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। তাহলে কেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলো? কেন আগেভাগে সফটওয়্যার আপডেট, সার্ভার প্রস্তুতি ও বিল সাবমিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়নি? এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। বরং প্রতিবারের মতো এবারও দায় চাপানো হচ্ছে তথাকথিত “কারিগরি জটিলতার” ওপর।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এমনিতেই নানা আর্থিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করেন। ঈদের সময় পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন মেটাতে বেতন ও উৎসব ভাতার ওপরই তাদের সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতে হয়। অথচ সেই সময়েই যদি বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে তা শিক্ষকদের মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। অনেক শিক্ষক ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বছরের পর বছর একই নাটক মেনে নেওয়া যায় না। তারা মনে করছেন, শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যদি সত্যিই শিক্ষকদের ঈদের আগে বেতন-ভাতা দেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছা থাকে, তাহলে অবিলম্বে সার্ভার জটিলতা দূর করে বিল সাবমিটের সময়সীমা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে আগাম পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি ঈদের আগেই শিক্ষকদের সঙ্গে এমন প্রহসন চলতেই থাকবে, আর বারবার “কারিগরি জটিলতা”র অজুহাতে প্রকৃত দায় আড়াল করার চেষ্টা করা হবে।
Leave a Reply