ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘গণভোট ও অধ্যাদেশ: ছাত্রনেতৃত্বের ভূমিকা’ শীর্ষক সংস্কার সংলাপের তৃতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে ডাকসু প্রাঙ্গণে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম। এতে দেশের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নেতারা অংশ নেন এবং তারা দ্রুত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জনগণের গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত রায় উপেক্ষা করা হলে ছাত্রসমাজ আবারও আন্দোলনে নামতে পারে এবং প্রয়োজনে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামবে।
আলোচনায় অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) জিএস মো. মাজহারুল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদ আহসান, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমুল হাসান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ রায়হান আলী, বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স, বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্র সমাজের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল আজিজ এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের সহ-সভাপতি খায়রুল আহসান মারজানসহ অনেকে।
বক্তব্যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, জুলাই আন্দোলনের যে চেতনা তৈরি হয়েছিল তার সঙ্গে কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছালেও পরবর্তীতে অনেকেই সেখান থেকে সরে এসেছে। তার ভাষায়, অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দ্বন্দ্বের কারণেই দেশ বিভিন্ন সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে দেশের জন্য তা ইতিবাচক হবে এবং এতে কোনো পক্ষের ক্ষতির কারণ নেই। তবে জনমতের প্রতি অবজ্ঞা করা হলে ছাত্রসমাজ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আবারও রাজপথে নামবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল আজিজ বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সংসদীয় ফলাফলের পাশাপাশি গণভোটেও জনগণ সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট মত দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিপুল সংখ্যক মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদভুক্ত সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা জনগণের আমানত। কিন্তু সরকার সেই রায় বাস্তবায়নে আন্তরিক নয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভোটের অঙ্গীকার থেকে সরে না গিয়ে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করা উচিত।
জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণভোটের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইতিহাস রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, গণভোট জনগণের মত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং এর রায় উপেক্ষা করা হলে তা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী হবে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রসমাজ অতীতের মতো আবারও জেগে উঠতে পারে যদি জনগণের রায়কে অবমূল্যায়ন করা হয়।
বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের মাধ্যমে দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে স্বৈরাচারী প্রবণতা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, একাধিক রাজনৈতিক দল আগেও সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও বাস্তবে তা উপেক্ষিত হচ্ছে। তার মতে, জনগণের প্রায় বড় অংশই পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি সংসদে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের সভাপতি মুহাম্মদ রায়হান আলী বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের সুযোগ নষ্ট করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বৈষম্য দূর করা। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। তিনি ঐতিহাসিক বিভিন্ন আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রত্যাশা অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি। তার মতে, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে জনগণের আকাঙ্ক্ষা বারবার ব্যাহত হয়েছে।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সহ-সভাপতি খায়রুল আহসান মারজান বলেন, জুলাই আন্দোলনের সফলতার পেছনে ছাত্রসমাজের বড় ভূমিকা থাকলেও পরবর্তীতে সেই ঐক্য ধরে রাখা যায়নি। তিনি স্বীকার করেন, আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ছাত্র নেতৃত্ব প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, ভবিষ্যতে আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ছাত্রসমাজকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্র সমাজের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, গণভোটে জনগণের অংশগ্রহণ ও সমর্থন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে জনগণ সংস্কার চায়। তিনি দ্রুত সেই রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের অর্জনকে সীমিত রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে ফেলে। তার মতে, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তিনি সতর্ক করেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে ছাত্রসমাজ আবারও আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, বিএনপির ঘোষিত নীতি ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটে জনগণের বড় অংশ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সেটিকে অস্বীকার করা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গেলে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, বর্তমান বিএনপি তাদের আগের রাজনৈতিক আদর্শ ও জনআকাঙ্ক্ষা থেকে সরে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তার অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে দলটির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, সংস্কার ও জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন থেকে সরে গেলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির পূর্বে ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতে যে সংস্কার প্রস্তাব ছিল, তা এখন বাস্তবায়নে অনীহা দেখা যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি সবাইকে আহ্বান জানান, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে যেতে হবে।
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান উদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এম এম আল মিনহাজ, এবং কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনির ও রাইসুল ইসলাম প্রমুখ।
Leave a Reply