প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে এ নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয় এবং শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (এসকেটি) অধ্যয়নরত সব শিক্ষার্থী এই উপবৃত্তি কার্যক্রমের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তারা সরকারের এ সহায়তা পাবে।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, উপবৃত্তির অর্থ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ ক্রয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা উপকরণ, স্কুলব্যাগ, ছাতা, স্কুল ড্রেস, জুতা, টিফিন বক্সসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। মূলত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো, শিক্ষা কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা এবং দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি বিতরণ কার্যক্রম সরকারের ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল’-এর আওতায় পরিচালিত হবে এবং সেই নীতিমালার নির্দেশনা অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকাশিত নির্দেশিকায় উপবৃত্তির অর্থের পরিমাণও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মাসিক ৭৫ (পঁচাত্তর) টাকা হারে উপবৃত্তি পাবে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যদি কোনো পরিবারের একজন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে, তাহলে সে মাসিক ১৫০ (একশত পঞ্চাশ) টাকা পাবে। একই পরিবারের দুইজন শিক্ষার্থী প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করলে তারা মাসিক মোট ৩০০ (তিনশত) টাকা উপবৃত্তি পাবে। এছাড়া যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি চালু রয়েছে, সেসব বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও আলাদা হারে উপবৃত্তি দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে কোনো পরিবারের একজন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করলে সে মাসিক ২০০ (দুইশত) টাকা পাবে। আর একই পরিবারের দুইজন শিক্ষার্থী থাকলে তারা মাসিক ৪০০ (চারশত) টাকা হারে উপবৃত্তি পাবে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে ভবিষ্যতে এই উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো যেতে পারে। এছাড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রমের আওতায় একটি পরিবারের সর্বোচ্চ দুইজন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পাওয়ার সুযোগ পাবে।
উপবৃত্তি পাওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর ন্যূনতম বয়স হতে হবে ৪ বছর এবং প্রতিমাসে পাঠদিবসের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ উপস্থিত থাকতে হবে। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রতিমাসে অন্তত ৮০ শতাংশ পাঠদিবসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতিমাসে পাঠদিবসের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ উপস্থিতির পাশাপাশি পূর্ববর্তী শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় নির্ধারিত নম্বর প্রাপ্তির শর্তও প্রযোজ্য থাকবে। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নম্বরের শর্ত কিছুটা শিথিল রাখা হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর এবং প্রতি বিষয়ে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নম্বর প্রাপ্তির শর্ত প্রযোজ্য হবে।
নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী যদি নতুন বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তাহলে তার ছাড়পত্রে পূর্ববর্তী শ্রেণিতে প্রাপ্ত নম্বরের তথ্য উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। এ জন্ম নিবন্ধন সনদ বাংলা ভাষায় থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে ইংরেজি সংস্করণও থাকতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নিবন্ধিত একটি মোবাইল নম্বর থাকতে হবে এবং সেই মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে একটি সক্রিয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই উপবৃত্তির অর্থ প্রদান করা হবে।
নির্দেশিকায় আরও কিছু অতিরিক্ত শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী যদি বার্ষিক পরীক্ষায় নির্ধারিত নম্বর অর্জন করতে না পারে, তাহলে তাকে উপবৃত্তি পাওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে। একইভাবে যদি কোনো শিক্ষার্থী ধারাবাহিকভাবে তিন মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তার উপবৃত্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে। এছাড়া কোনো মাসে শিক্ষার্থী যদি নির্ধারিত ৮০ শতাংশ উপস্থিতির শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই মাসের উপবৃত্তি প্রদান করা হবে না। তবে পরবর্তী সময়ে যদি শিক্ষার্থী আবার শর্ত পূরণ করে, তাহলে সেই মাস থেকে পুনরায় উপবৃত্তি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।
শিক্ষার্থীদের প্রতিমাসে যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতীত কমপক্ষে ৮০ শতাংশ পাঠদিবসে উপস্থিত থাকতে হবে। কোন কারণ যুক্তিসঙ্গত বলে বিবেচিত হবে তা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নির্ধারণ করবেন। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে উপস্থিতির শর্ত কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। তাদের উপস্থিতি যদি ৮০ শতাংশের কম হয়, তাহলে প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার যুক্তিসঙ্গত কারণ বিবেচনায় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত উপস্থিতির শর্ত শিথিল করতে পারবেন।
এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের কোনো এলাকায় যদি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হয় এবং বিদ্যালয়ের পাঠদান সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে, তাহলে সেই সময়ের উপস্থিতির দিনগুলো বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের মাসিক উপস্থিতি নির্ধারিত হারের চেয়ে কম হলেও উপবৃত্তি প্রদান করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের অনুমোদন থাকতে হবে। নির্দেশিকায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, জুন মাসের উপবৃত্তির অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রে ১০ জুন পর্যন্ত পাঠদিবসের অন্তত ৮০ শতাংশ উপস্থিতির ভিত্তিতে উপবৃত্তি প্রদান করা যাবে।
Leave a Reply