বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবির কেন্দ্রে রয়েছে উৎসব ভাতা বৈষম্য। বর্তমানে তারা মূল বেতনের মাত্র ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা পান, যেখানে সরকারি চাকরিজীবীরা পান শতভাগ। এই বাস্তবতায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন যে আশ্বাস দিয়েছেন—চলতি সরকারের মেয়াদেই উৎসব ভাতা শতভাগ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে—তা শিক্ষক সমাজে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করেন, বিষয়টি তার নজরে আছে এবং এটি কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজও শুরু হয়েছে। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি, অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ এবং এমপিও খাতের আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন হবে। কারণ বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা কয়েক লাখ; তাদের সবার জন্য ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশে উৎসব ভাতা উন্নীত করা মানে বছরে কয়েকশ’ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়।
এমপিও (Monthly Pay Order) ব্যবস্থার আওতায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরকারের নির্ধারিত স্কেল অনুযায়ী মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান। কিন্তু বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, উৎসব ভাতা—এসব ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে পার্থক্য রয়ে গেছে। শিক্ষক নেতারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন, একই শিক্ষাব্যবস্থায় সমমানের দায়িত্ব পালন করেও কেন তারা কম সুবিধা পাবেন? বিশেষ করে রমজান ও ঈদুল ফিতর কিংবা দুর্গাপূজার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবের আগে পরিবার-পরিজনের চাহিদা মেটাতে অর্ধেক উৎসব ভাতা যথেষ্ট নয় বলে তারা মনে করেন। ফলে শতভাগ উৎসব ভাতা শুধু আর্থিক সুবিধা নয়, মর্যাদা ও বৈষম্য নিরসনের প্রশ্ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী একই সঙ্গে এমপিওভুক্তির নতুন আবেদনগুলো নিয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। নির্বাচনের আগে যেসব আবেদন জমা পড়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। অতীতে এমপিওভুক্তি নিয়ে অনিয়ম, তদবির বা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল—সেসব বিষয় খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। এতে বোঝা যাচ্ছে, সরকার একদিকে সুবিধা বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে চায়।
শিক্ষকদের বহুল প্রত্যাশিত বদলি প্রক্রিয়াও দ্রুত চালুর কথা বলেছেন মন্ত্রী। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও সহজে বদলির সুযোগ পান না, ফলে পারিবারিক বা স্বাস্থ্যগত কারণে সমস্যায় পড়েন অনেকেই। বদলি নীতিমালা চালু হলে শিক্ষকরা জেলা বা বিভাগভিত্তিক শূন্যপদের ভিত্তিতে স্থানান্তরের সুযোগ পাবেন—এমনটাই আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বেতন পরিশোধে বিলম্ব হলে তা পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। অনেক সময় কারিগরি জটিলতা বা ফাইল প্রক্রিয়াজটের কারণে মাসের ১০ তারিখের পর বেতন পান শিক্ষকরা; সরকার এ প্রক্রিয়া ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার চিন্তাও করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে উৎসব ভাতা শতভাগ করা, এমপিওভুক্তির আবেদন স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি, বদলি প্রক্রিয়া চালু এবং বেতন সময়মতো প্রদান—এই চারটি ইস্যু এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশার কেন্দ্রে। সরকারের ঘোষিত আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে তা শুধু আর্থিক স্বস্তিই দেবে না, বরং বেসরকারি শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতাও বাড়াবে। এখন দেখার বিষয়, বাজেট ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতা অতিক্রম করে এ প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতিতে রূপ নেয়।
Leave a Reply