বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আগ্রহের পারদ আরও বেড়েছে। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান, সহকারী প্রধান, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার ও সহকারী সুপার পদে চলমান আবেদনের সময়সীমা সাতদিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। আজ বৃহস্পতিবার আবেদনের শেষ দিন হওয়ার কথা থাকলেও নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, খুব দ্রুতই এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
এই সময়সীমা বৃদ্ধি প্রার্থীদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সারাদেশে একযোগে বিপুলসংখ্যক শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ায় অনেকেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন সম্পন্ন করতে পারেননি। বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চল, ইন্টারনেট জটিলতা ও কাগজপত্র প্রস্তুত সংক্রান্ত সমস্যার কারণে বহু প্রার্থী সময় বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
এনটিআরসিএর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মোট ১৩ হাজার ৫৫৯টি শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে এই সংখ্যা কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তিনটি অধিদপ্তরের আওতায় এসব পদ বণ্টিত হয়েছে—মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় সর্বাধিক ১০ হাজার ২৭৮টি শূন্যপদ রয়েছে। এর মধ্যে স্নাতক পাস কলেজে অধ্যক্ষ ৫৮৪টি এবং উপাধ্যক্ষ ৬২৭টি পদ খালি। উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে অধ্যক্ষ ৫১১টি এবং উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ ২৫৭টি পদ রয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ৩ হাজার ৯২৩টি ও সহকারী প্রধান শিক্ষক ৩ হাজার ৮৭২টি পদ শূন্য। এছাড়া নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ রয়েছে ৫০৪টি। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, সাধারণ ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেতৃত্ব সংকট সবচেয়ে বেশি।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে মোট ১৯০টি শূন্যপদ রয়েছে। ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যক্ষ ১১০টি, ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানে সুপারিনটেনডেন্ট ৪০টি এবং সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট ৪০টি পদ খালি আছে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বাড়লেও নেতৃত্ব পর্যায়ে এই শূন্যতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল।
অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় মোট ৩ হাজার ১৩১টি শূন্যপদ রয়েছে। কামিল পর্যায়ে অধ্যক্ষ ৩৪টি ও উপাধ্যক্ষ ৫৩টি, ফাজিল পর্যায়ে অধ্যক্ষ ২০২টি ও উপাধ্যক্ষ ৩৪৩টি, আলিম পর্যায়ে অধ্যক্ষ ২১৯টি ও উপাধ্যক্ষ ৩৭৭টি পদ খালি। দাখিল পর্যায়ে সুপারিনটেনডেন্ট ৮৯৯টি এবং সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট ১ হাজার ৪টি পদ শূন্য রয়েছে। এই পরিসংখ্যান মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশাসনিক নেতৃত্বের বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র তুলে ধরে।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধু শূন্যপদ পূরণের বিষয় নয়; বরং শিক্ষার মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বা অস্থায়ী দায়িত্বে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ায় একাডেমিক কার্যক্রম, আর্থিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। স্থায়ীভাবে যোগ্য ও নিবন্ধিত প্রার্থীদের মাধ্যমে এসব পদ পূরণ হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিবন্ধন সনদের শর্তাবলি ভালোভাবে যাচাই করে আবেদন সম্পন্ন করা। অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণের সময় তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য ভবিষ্যতে প্রার্থীতা বাতিলের কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে সংরক্ষণ রাখা উচিত, যাতে যাচাইকরণ পর্যায়ে কোনো জটিলতা না হয়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সাতদিন সময় বৃদ্ধি প্রার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ, দ্রুত ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যাতে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ নেতৃত্ব পায় এবং শিক্ষার মান আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।
Leave a Reply