২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে তিন ধাপে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জুলাই মাস থেকেই নতুন কাঠামোর অধীনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন পেতে শুরু করতে পারেন। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল মূল বেতনের অংশ বাড়ানো হলেও ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বাস্তবায়নে আরও অন্তত দুই অর্থবছর সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত পে-কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় সেই সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই বেতন বৃদ্ধির জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটের একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।
গত সোমবার (৪ মে) অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন তিনটি ধাপে সম্পন্ন করার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি দেওয়া হতে পারে। তবে এই বৃদ্ধি সরাসরি পে-কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী হবে না। বরং কমিশনের প্রস্তাবিত মূল বেতন বৃদ্ধির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নির্ধারণ করার পর, সেই সমন্বিত অঙ্কের ওপর ভিত্তি করে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই আমরা কাজ করছি। খুব শিগগিরই বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে।’ তিনি আরও জানান, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কঠিন। তাই মূল বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।’
সূত্র আরও জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে এবং পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অংশ দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে, ভাতা সংক্রান্ত পরিবর্তনগুলো ২০২৮-২৯ অর্থবছরে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এভাবে যদি নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে যে জটিলতাগুলো সামনে আসবে তা হলো পে ফিক্সেশন। আমরা সকলেই জানি নতুন বেতন কমিশন বাস্তবায়ন হলে যে বিষয়টি সবার সামনে আসে তাহলো পে ফিক্সেশন। পে ফিক্সেশন যদি খন্ডিত আকারে করা হয় তাহলে তা বাস্তবায়ন যোগ্য করা প্রায় অসম্ভব। যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গিয়েছে। তবে আশার কথা হলো এই যে, নতুন পে স্কেল প্রকৃতপক্ষে কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তা এখনও কোনও প্রস্তাবই চুড়ান্ত আকারে গৃহীত হয়নি। একাধিক বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে তার মধ্যে যা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সেটাই গ্রহণ করা হবে।
পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্য হলো জাতীয় স্কেলের আওতাভুক্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। তবে এভাবে যদি পে স্কেল বাস্তবায়ন হয় তাতে কর্মকর্তা কর্মচারীদের জীবনমান কতটা উন্নয়ন ঘটবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। কারণ যে পরিমাণ বেতনের বৃদ্ধি হবে তা শুধু নামই হবে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবে তা আরও অধিকতর পীড়াদায়ক হবে বলে মনে হয়।
উল্লেখ্য, সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের সুপারিশসম্বলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই সময় জানানো হয়, বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
নতুন পে-স্কেল প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় (জুডিশিয়াল সার্ভিস) ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক বেতন কমিশনের প্রতিবেদনও প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তিনটি প্রতিবেদনের সুপারিশ সমন্বয়ের জন্য গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়নের কাজ করছে।
Leave a Reply