বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ১ম থেকে ১২তম নিবন্ধনধারীদের নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি ফাইল উত্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ফাইলটি উপসচিব এবং যুগ্মসচিবের টেবিল অতিক্রম করে পরবর্তী ধাপে পৌঁছেছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল ২০২৬) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, ১ম থেকে ১২তম নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে। এই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত নিবন্ধনধারীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দিয়েছেন। আবেদনটি বিবেচনাযোগ্য কি না, তা যাচাই করার জন্য ডিজিটাল নথি (ডি-নথি) পদ্ধতিতে ফাইলটি উত্থাপন করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, “১ম থেকে ১২তম নিবন্ধনধারীদের ফাইল তোলা হয়েছে। এখন বেসরকারি মাধ্যমিক শাখার অতিরিক্ত সচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব এ বিষয়ে তাদের মতামত প্রদান করবেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে কোন প্রক্রিয়ায় এই নিবন্ধনধারীদের নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “১ম থেকে ১২তম নিবন্ধনধারীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বর্তমানে চলমান রয়েছে। মামলাগুলো চলমান থাকা অবস্থায় নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। এ বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত আসতে হবে। তারপরই তাদের নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।”
এর আগে, যেসব ১ম-১২তম নিবন্ধনধারী প্রার্থীর বয়স ৩৫ বছর অতিক্রম করেছে এবং নিবন্ধন সনদের মেয়াদ ৩ বছর অতিক্রম হয়েছে, তাদের বিষয়ে এনটিআরসিএ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছিল। শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নির্দেশনা অনুসারে গত মার্চ মাসে এই সারসংক্ষেপ মন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়া হয়।
এনটিআরসিএ জানিয়েছে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫ (১ নং আইন)-এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১ম থেকে ১২তম নিবন্ধনধারী প্রার্থীদের শুধুমাত্র প্রত্যয়নপত্র (Certificate) ইস্যু করা হয়েছে। নিবন্ধনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য আবেদন করার সুযোগ ছিল এবং ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হতো।
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫-এর ধারা ১০(২) অনুসারে, “কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত শিক্ষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, নিবন্ধিত ও প্রত্যয়নকৃত না হলে কোনো ব্যক্তি কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।” তবে এনটিআরসিএ থেকে ১ম-১২তম নিবন্ধনধারীদের দেওয়া প্রত্যয়নপত্র শুধুমাত্র শিক্ষকতার জন্য আবেদন করার যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতো। এটি কোনোভাবেই চাকরির নিশ্চয়তা প্রদান করে না।
এনটিআরসিএ আরও জানিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৫ সালের একটি পরিপত্রের মাধ্যমে এনটিআরসিএকে নিয়োগ সুপারিশের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর ১ম গণবিজ্ঞপ্তিতে ১ম-১২তম ব্যাচের সকল প্রার্থী আবেদন করার সুযোগ পান। আবেদনকারীদের মধ্য থেকে মেধার ভিত্তিতে শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ সুপারিশ করা হয়।
পরবর্তীতে ১৩তম এবং তার পরবর্তী ব্যাচের সাথে ২য়, ৩য় ও ৪র্থ নিয়োগ সুপারিশ বিজ্ঞপ্তিতেও ১ম-১২তম ব্যাচের প্রার্থীরা আবেদনের সুযোগ পান। তবে শূন্য পদের অভাব এবং মেধাতালিকায় পিছিয়ে থাকার কারণে অনেকেই নিয়োগ সুপারিশ পাননি।
১ম-১২তম ব্যাচের প্রার্থীরা নিয়োগের দাবিতে রিট পিটিশন নং-১৩২৪/২০১৭ সহ মোট ১৬৬টি রিট মামলা দায়ের করেন। রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ৭টি Directions and Guideline প্রদান করেন। উক্ত নির্দেশনা অনুসারে এমপিও নীতিমালায় (মাধ্যমিক-২) বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণ করা হয় এবং এনটিআরসিএ জাতীয় মেধা তালিকা প্রণয়ন করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার সিভিল আপিল (নং-৭১/২০২৩) দায়ের করে। আপিল বিভাগ Directions and Guidelineসহ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেন। পরে রিট পিটিশনাররা আপিল বিভাগে রিভিউ পিটিশন দায়ের করেন, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। রিভিউ পিটিশনের প্রেক্ষিতে মেয়াদ ফলাফল প্রকাশের তারিখ থেকে ৩ বছর বহাল রাখা হয়েছে।
এছাড়া, ৩৫ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা প্রার্থীরা নিয়োগ সুপারিশ বিজ্ঞপ্তির আওতায় আবেদনের সুযোগ চেয়ে একাধিক রিট মামলা দায়ের করেছেন। সেসব মামলার সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলও দায়ের করা হয়েছে।
সর্বশেষ এনটিআরসিএ জানিয়েছে, রিট পিটিশনারদের দায়ের করা সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলের মোট ১৯টি মামলার মডিফিকেশন আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। এছাড়া, রিট মামলার নির্দেশনা অনুসারে এমপিও নীতিমালায় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বয়স ৩৫ বছর এবং সনদের মেয়াদ ৩ বছর সংক্রান্ত বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগ এবং সলিসিটর অনুবিভাগের মতামত প্রয়োজন।
এই মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এমপিও নীতিমালায় বয়স ৩৫ বছর ও সনদের মেয়াদ ৩ বছর সংশোধন করে এনটিআরসিএ-কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করতে হবে বলে জানানো হয়েছে।
Leave a Reply