শিক্ষা ক্যাডারের ভেতরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর মহাপরিচালক (ডিজি) পদকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সংস্থাটি দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজের তদারকি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিসিএস ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তা প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলকে। তবে তাকে এই পদে বসানো নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জ্যেষ্ঠতার নিয়ম উপেক্ষা করে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কোনো দপ্তর বা সংস্থার প্রধান পদ শূন্য হলে সাধারণত সেই প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই কাউকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। এটি দীর্ঘদিনের একটি প্রশাসনিক রীতি। কিন্তু অধ্যাপক সোহেলকে ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, তিনি মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এই পদে তাকে বসানো হয়েছে—এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছে প্রশাসনের ভেতরে।
সূত্র মতে, বর্তমানে মাউশিতে বিসিএস ১৪ ব্যাচের কর্মকর্তারা কর্মরত রয়েছেন, যারা জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে অধ্যাপক সোহেলের চেয়ে এগিয়ে। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে দুই ব্যাচ জুনিয়র একজন কর্মকর্তাকে এত গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোয় শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর একটি সরকারি কলেজের একজন অধ্যক্ষ জানান, শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অধ্যাপক সোহেল তার একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে কার্যত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি অনেকটা প্রভাব খাটিয়ে ওই পদটি দখল করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় নিজের পছন্দের লোকদের পদায়ন করানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন ওই অধ্যক্ষ। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মাউশির বেশ কয়েকজন পরিচালকই তার ব্যাচমেট। এমন একজন ব্যক্তিকে, যিনি বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে, তাকে কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হলো—তা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয়। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ফলে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষামন্ত্রীর পিএস হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক সোহেল। যদিও এর আগ থেকেই তিনি ওই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পরে গত বৃহস্পতিবার তিনি পিএস পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মন্ত্রণালয়ের ভেতরে আলোচনা রয়েছে, মাউশির ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই তিনি এই পদত্যাগ করেন। অর্থাৎ ডিজির পদ পাওয়ার পথ সুগম করতেই তিনি পিএস পদ ছেড়েছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। পদত্যাগের মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে মাউশির ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা পুরো ঘটনাকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, এটি সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে তার কিছু বলার নেই। তবে তিনি দাবি করেন, অতীতেও মাউশির ডিজি পদে জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার নজির রয়েছে।
এদিকে, তার এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শুধু ডিজির দায়িত্ব পাওয়াই নয়, একজন পিএইচডিধারী অধ্যাপক হয়ে মন্ত্রীর পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষা খাতের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন বিভাগের পরিচালক এবং বিসিএস ১৪ ব্যাচের কর্মকর্তা প্রফেসর কাজী মো. আবু কাইয়ুম এ প্রসঙ্গে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী প্রথমে অধ্যাপক সোহেলকে পিএস হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব বাতিল হওয়ার পর তিনি নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে সোহেলকে মাউশির ডিজির দায়িত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সোহেল তার চেয়ে দুই ব্যাচ জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক নিয়মের পরিপন্থী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, একজন পিএইচডিধারী অধ্যাপক যদি মন্ত্রীর পিএস হন, তাহলে হয় তিনি অধ্যাপক হওয়ার যোগ্য নন, নতুবা যিনি তাকে এই পদে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি মন্ত্রী হওয়ার যোগ্য নন। তিনি আরও বলেন, একজন অধ্যাপকের কাজ হলো গবেষণা করা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে সরে এসে একজন অধ্যাপক যখন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পদে যুক্ত হন, তখন তা তার পেশাগত মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তার ভাষায়, অধ্যাপক সোহেল নিজের অধ্যাপক পদ ও পিএইচডি ডিগ্রির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন এবং সেই প্রভাব খাটিয়েই তিনি এখন মাউশির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন—যা দেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত ও প্রভাবশালী একটি পদ।
এই পুরো বিষয়ে জানতে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Leave a Reply