সরকার প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তির সংখ্যা এবং অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যা আগামী অর্থবছর থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে বৃত্তির অর্থের পরিমাণ অত্যন্ত কম। তিনি বলেন, বৃত্তির অর্থ বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং অর্থ বিভাগের সম্মতিও পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে একই পরিমাণ অর্থ বৃত্তি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, যা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাজারদর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, কিন্তু বৃত্তির অর্থ অপরিবর্তিত থাকায় শিক্ষার্থীরা কার্যত কোনো উপকার পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বৃত্তির টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় একটি বই কেনাও সম্ভব হয় না; সর্বোচ্চ তিন থেকে চারটি খাতা কেনা যেতে পারে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যদি এই অর্থ দিয়ে প্রাইভেট পড়তে চায়, তাহলে মফস্বল এলাকাতেও শিক্ষকরা ওই টাকায় পড়াতে রাজি হন না। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বৃত্তির অর্থ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে বৃত্তির সংখ্যা ও অর্থ বাড়ানোর প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে আগামী অর্থবছর থেকেই তা কার্যকর হবে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের শেষে যারা পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে, তারা নতুন হারে বৃত্তির অর্থ পাবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে জুনিয়র বৃত্তি পায় মোট ৪৬ হাজার ২০০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ট্যালেন্টপুলে রয়েছে ১৪ হাজার ৭০০ জন এবং সাধারণ কোটায় রয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ জন। এই সংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়িয়ে মোট ৫৫ হাজার ৪৪০ জনে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ট্যালেন্টপুলে ১৭ হাজার ৬৪০ জন এবং সাধারণ কোটায় ৩৭ হাজার ৮০০ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পাবে। ফলে অতিরিক্ত ৯ হাজার ২৪০ জন শিক্ষার্থী নতুন করে বৃত্তির আওতায় আসবে।
একই সঙ্গে জুনিয়র বৃত্তির অর্থও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ট্যালেন্টপুলে মাসিক ভাতা ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯০০ টাকা এবং বার্ষিক এককালীন অনুদান ৫৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ১২০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ কোটায় মাসিক ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা এবং বার্ষিক অনুদান ৩৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বৃত্তি নবম ও দশম শ্রেণিতে দুই বছর পর্যন্ত, অর্থাৎ এসএসসি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত দেওয়া হবে।
অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিক বৃত্তির সংখ্যা ৮২ হাজার ৫০০। এর মধ্যে ৩৩ হাজার মেধাবৃত্তি এবং ৪৯ হাজার ৫০০ সাধারণ বৃত্তি রয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরা একই প্রশ্নপত্রে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। তবে শিক্ষার্থীসংখ্যা বেশি হওয়ায় সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ এবং বেসরকারি (কিন্ডারগার্টেন) শিক্ষার্থীদের জন্য ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হবে।
এ অনুযায়ী, ৩৩ হাজার মেধাবৃত্তির মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ২৭ হাজার ৫০০ এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৫ হাজার ৫০০ নির্ধারণ করা হবে। একইভাবে ৪৯ হাজার ৫০০ সাধারণ বৃত্তির মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৪১ হাজার ২৫০ এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৮ হাজার ২৫০ বৃত্তি বরাদ্দ থাকবে। এছাড়া প্রাথমিক বৃত্তির মোট সংখ্যা বাড়িয়ে এক লাখে উন্নীত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে মেধাবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা মাসে ৩০০ টাকা এবং বছরে এককালীন ২২৫ টাকা পায়। সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্তরা মাসে ২২৫ টাকা এবং বছরে ২২৫ টাকা পায়। নতুন প্রস্তাবে এই অর্থ দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিক বৃত্তি সাধারণত ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত, অর্থাৎ তিন বছর ধরে দেওয়া হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, সরকার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার নীতিমালায় পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনা করছে। বৃত্তির অর্থের পরিমাণ এবং কতসংখ্যক শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে, তা নতুনভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা চালু হয়। এরপর থেকে পৃথক বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায় এবং পিইসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হতো। তবে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে পিইসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি এবং পরবর্তীতে ২০২২ সাল থেকে এটি স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়। একই বছরের শেষ দিকে হঠাৎ করে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হলেও ২০২৩ সালে তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৫ সালে পুনরায় বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তা স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষা চলতি বছরে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইতোমধ্যে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
একইভাবে দীর্ঘ ১৬ বছর পর গত বছর থেকে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করা হয়েছে। আগে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এই বৃত্তি প্রদান করা হতো। ২০২২ সালে জেএসসি পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে তিন বছর ধরে এই বৃত্তি কার্যক্রমও বন্ধ ছিল। তবে ২০২৫ সাল থেকে আবার এই বৃত্তি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
Leave a Reply