২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে উন্নতমানের পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। তবে মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় আসন্ন শিক্ষাবর্ষের জন্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি সংখ্যক বইয়ের চাহিদা জানানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে এনসিটিবি। জেলা, থানা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা অফিস থেকে পাঠানো বইয়ের চাহিদার সঠিকতা যাচাই করতে এনসিটিবি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর যৌথভাবে গঠিত ৩৪টি মনিটরিং টিম মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। দেশের প্রায় সব উপজেলায় এসব টিম বুধবার ও বৃহস্পতিবার সরেজমিন যাচাই কার্যক্রম শেষ করে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এনসিটিবি ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়িসহ) মোট পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা ছিল ২১ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ২৭৪ কপি। কিন্তু ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মাঠপর্যায়—অর্থাৎ জেলা, থানা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলো থেকে যে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে, তাতে বইয়ের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে। সারাদেশ থেকে সংগৃহীত এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে গত বছরের তুলনায় বড় ধরনের গড়মিল লক্ষ্য করে এনসিটিবি। এর প্রেক্ষিতে চলতি মাসের ৯ এপ্রিল বিষয়টি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি চিঠি পাঠানো হয় এবং জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও সতর্ক করা হয়।
এনসিটিবির পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সহায়তায় জেলা, উপজেলা ও থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসগুলো এনসিটিবির ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা জমা দিয়েছে। তবে সেই চাহিদার যথার্থতা যাচাই করতে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে একটি উপজেলা নির্বাচন করে এনসিটিবির কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সেখানে দেখা যায়, প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক বই চাওয়া হয়েছে, যা পুরো ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
জানা গেছে, প্রতিবছর সরকারিভাবে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ছাপানোকে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, অসাধু কিছু প্রেস মালিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের একটি অংশ এই অনিয়মে জড়িত থাকেন। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বই দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়া হয়। এরপর কিছু ক্ষেত্রে বই না ছাপিয়েই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়, আবার কোথাও বই ছাপানোর পর সেগুলো বাজারে কেজি দরে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নীরব সহযোগিতায় এ ধরনের অনিয়ম চলমান রয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, মাঠপর্যায় থেকে এ বছর যে পরিমাণ বইয়ের চাহিদা এসেছে, তা গত বছরের তুলনায় বেশি মনে হচ্ছে। তাই প্রকৃত চাহিদা যাচাই করতে এনসিটিবির ৩০টি টিম সারাদেশে কাজ করছে।
এ বছর প্রাপ্ত চাহিদা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু উপজেলায় পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কোথাও ২০২৬ সালের তুলনায় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ১৭৯ শতাংশ বেশি চাহিদা দেখানো হয়েছে, আবার অন্য কোনো উপজেলায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এই অস্বাভাবিক তারতম্যের কারণে তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়। পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত মনিটরিং টিম ১৫ ও ১৬ এপ্রিল সারাদেশের সব জেলায় অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা তদারকিতে মাঠে নামে।
এছাড়া আগামী ১৮ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রী সারাদেশের মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল সভা (জুম মিটিং) করার কথা রয়েছে। মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে কোনো অনিয়ম বা অসঙ্গতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান আরও জানান, পাঠ্যপুস্তক নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ১৮ এপ্রিল সারাদেশের শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। নতুন সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তকে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন করা হবে, যা প্রতি বছরই একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে সম্পন্ন হয়।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে যেসব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর বিষয়েও তদন্ত চলছে। তবে সব কার্যক্রমই নির্ধারিত নিয়ম ও নীতিমালার মধ্যেই পরিচালিত হবে এবং কোনো অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না।
Leave a Reply