‘ভাউচার বাণিজ্য’ বর্তমানে অধিকাংশ এমপিওভুক্ত প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও সুপারদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত অভিযোগ হিসেবে সামনে আসছে। শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়—নোট-গাইড কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়, প্রতিষ্ঠানের এফডিআর ও ব্যাংকে জমাকৃত বিপুল অর্থ, প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন দোকান, অডিটোরিয়াম ও খেলার মাঠ ভাড়া দিয়ে অর্জিত আয়ের অর্থ আত্মসাৎ—এসব অভিযোগও নিয়মিতভাবে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে আসছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অভিযোগগুলো করেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধস্তন শিক্ষক-কর্মচারীরাই। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অনিয়মের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানদের পাশাপাশি হিসাব শাখার কর্মচারীরাও জড়িত থাকেন। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার সুযোগে তারা একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। এ কারণে বহুদিন ধরেই সাধারণ শিক্ষকরা দাবি জানিয়ে আসছেন—সহকারী শিক্ষক ও প্রভাষকদের মতোই প্রতিষ্ঠান প্রধান ও কর্মচারীদেরও বদলির আওতায় আনা হোক।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল যখন নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দায়িত্ব গ্রহণের পরই বদলির নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেন। তিনি প্রতিষ্ঠান প্রধান ও কর্মচারীদের বদলির আওতায় আনার নির্দেশ দেন এবং সেই অনুযায়ী সফটওয়্যার তৈরিরও নির্দেশনা দেন। মন্ত্রীর এই পদক্ষেপে দেশের লাখ লাখ সাধারণ শিক্ষক আশাবাদী হয়ে ওঠেন এবং ব্যাপক প্রশংসাও করেন।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন—এমনই একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের একাধিক সমিতির নেতাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই বদলির প্রক্রিয়া আটকে রাখার চেষ্টা করছে। তারা কৌশলে মন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন বিলম্বিত করতে চায়। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—সাধারণ শিক্ষকদের বদলি চালু হলেও যেন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা নিজেরা সেই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকতে পারেন। ফলে পুরো বদলি কার্যক্রমই দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ শিক্ষকরা, বিশেষ করে যারা এনটিআরসিএর সুপারিশে নিজ বাড়ি থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে কর্মরত।
এমনও অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, প্রতিষ্ঠান প্রধানদের এই সিন্ডিকেট নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সরকার তাদের অন্যত্র বদলি করে দিতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই তারা নিজেদের বদলির অপশন বাতিল বা বিলম্বিত করার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, প্রতিদিন সারাদেশে লাখ লাখ টাকার ভুয়া ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে, যেখানে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের পাশাপাশি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও হিসাব বিভাগের কর্মচারীরাও যুক্ত থাকেন।
শিক্ষক নেতা হাবিবুর রহমান এই পরিস্থিতির পেছনে দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, অনেকেই মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদে আসীন হয়েছেন। তাদের লক্ষ্য থাকে প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ব্যালেন্স, এফডিআর, বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর এবং নোট-গাইড কোম্পানির কাছ থেকে বছরের শুরুতেই এককালীন অর্থ সংগ্রহ করা। ফলে ভালো আর্থিক অবস্থার প্রতিষ্ঠান থেকে যদি কম শিক্ষার্থী ও আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে বদলি হতে হয়, তাহলে তাদের এই বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। দ্বিতীয়ত, নিজ এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গড়ে তোলা প্রভাববলয় হারানোর আশঙ্কাও তাদের মধ্যে কাজ করে।
তিনি আরও জানান, ময়মনসিংহ অঞ্চলের একজন মাদরাসা শিক্ষক নেতা এবং বরিশাল ও কুমিল্লার কয়েকজন প্রতিষ্ঠান প্রধান কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বদলি প্রক্রিয়া ঠেকানোর চেষ্টায় নেমেছেন—এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন বিলম্বিত করার পেছনে একজন অতিরিক্ত সচিব গোপনে ভূমিকা রাখছেন, যার রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন।
এ বিষয়ে প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান মত প্রকাশ করে বলেছেন, “সকলকে বদলির আওতায় আনা গেলে একটি কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থা তৈরি হবে। অন্যথায় কিছু প্রতিষ্ঠান প্রধান বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন।”
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ৩২ হাজারেরও বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজসহ হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি আর্থিক অবস্থাও শক্তিশালী। তবে মিশনারি পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের বিরুদ্ধে আর্থিক বা অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ তুলনামূলকভাবে খুবই বিরল।
Leave a Reply