শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় পরীক্ষার স্বচ্ছতা, শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন। শনিবার (১১ এপ্রিল) রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত রাজশাহী অঞ্চলের কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, অতীতে এমন নীতিমালা ছিল যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার ফলাফল শতভাগ অকৃতকার্য (জিরো পারসেন্ট পাস) হলে সেই প্রতিষ্ঠানের এমপিও (সরকারি আর্থিক সহায়তা) বাতিল করা হতো। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তিনি সেই কঠোর সিদ্ধান্ত আপাতত কার্যকর করবেন না বলে জানান। এর ব্যাখ্যায় মন্ত্রী বলেন, হঠাৎ করে শিক্ষকদের ওপর ভালো ফলাফলের চাপ সৃষ্টি করা এবং একইসঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগ—এই দুই বিষয় একসঙ্গে কার্যকর করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরীক্ষায় যেন কোনোভাবেই নকল না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের সন্তানদের নিজ প্রতিষ্ঠানে পড়াতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এর ফলে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যেখানে নামিদামি প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক তার কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তাকে ‘ব্যর্থ মন্ত্রী’ বলে মন্তব্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যারা এ ধরনের মন্তব্য করছেন, তাদের অনেকেই নিজের শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে পড়ান না বা খাতা মূল্যায়নেও দায়িত্বশীল নন। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়েও পড়ছে বলে তিনি মনে করেন।
মন্ত্রী অতীতের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে বলেন, একসময় মেধাবী শিক্ষার্থীরা গর্বের সঙ্গে বলত তারা জেলা স্কুলে পড়াশোনা করেছে, যা ছিল মানসম্মত শিক্ষার প্রতীক। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র বদলে গেছে। তিনি বলেন, অনেক জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সন্তানরা নিজ জেলার স্কুলে না পড়ে ঢাকায় পড়াশোনা করে, ফলে জেলা পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রত্যক্ষ তদারকি ও আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নীতিগতভাবে ডিসিদের সন্তানদের জেলা স্কুলে পড়াশোনা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন তিনি। তার মতে, এই ধরনের ‘মাইক্রো-লেভেল’ বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
রাজশাহী অঞ্চলের জীবনযাত্রা নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আগে তিনি ধারণা করতেন না যে এই অঞ্চলের মানুষ এতটা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন।
পরীক্ষা পরিচালনার বিষয়ে মন্ত্রী কঠোর অবস্থান তুলে ধরে বলেন, সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরীক্ষা আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ না থাকার অজুহাতে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ থাকার কথা কেউ বললে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তার ভাষায়, “ডাল মে কুচ কালা হে”—অর্থাৎ এতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তিনি জানান, আইপিএস ব্যবহারের মাধ্যমে অন্তত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সচল রাখা সম্ভব, এবং সিসিটিভি ক্যামেরা চালাতে খুব বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। এ বিষয়ে তিনি বিদ্যুৎ বিভাগ এবং প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রের সব ভিডিও ফুটেজ ও নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে যেকোনো সময় তদন্ত করা যায়। কোনো ধরনের গাফিলতি বা অসঙ্গতি ধরা পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জে একটি স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছেন, সবকিছু ভালো থাকলেও স্কুলটির মেঝে পাকা নয়। কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেঝে পাকা করলে নাকি গরম বেড়ে যায়। এ ধরনের যুক্তিকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন। অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০২-২০০৩ সালের দিকে তিনি এমন স্কুল পরিদর্শন করেছেন যেখানে সম্পূর্ণ নীরব পরিবেশে কোনো নকল ছাড়াই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো, যা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে একটি বড় পার্থক্য নির্দেশ করে।
সব মিলিয়ে, শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে শিক্ষার মানোন্নয়ন, নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষা প্রশাসনে দায়বদ্ধতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
Leave a Reply