বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, তীব্র যানজট এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনায় দেশের কিছু নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাসের সমন্বয়ে (হাইব্রিড পদ্ধতি) শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিনি জানান, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে এই পদ্ধতি চালু করা হবে না। বরং যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে—যেমন ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ এবং রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ—সেসব প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্পের আওতায় আনা হতে পারে। এর মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয়, যানজট কমানো এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বুধবার (৮ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্ব ইতিহাসে বিভিন্ন সংকট নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকেও কেবল হুমকি হিসেবে না দেখে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। অতীতে বিশ্বযুদ্ধ, প্রযুক্তিগত বিপ্লব কিংবা সামাজিক পরিবর্তনের মতো ঘটনাগুলো নতুন শিল্প ও সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। একইভাবে বর্তমান জ্বালানি সংকট, নগরীর যানজট এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন—সবকিছুকে কেন আমরা শুধুই সংকট হিসেবে দেখব, সুযোগ হিসেবেও তো দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থা হবে প্রযুক্তিনির্ভর এবং অনেকাংশেই কাগজবিহীন বা পেপারলেস। সংসদ থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত সর্বত্র ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। সেই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে তুলতে এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
জ্বালানি সাশ্রয় এবং যানজট কমানোর লক্ষ্যে নির্দিষ্ট কিছু ‘মানসম্পন্ন’ বা সক্ষম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাসের সমন্বিত পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনার কথা পুনরায় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এটি সব প্রতিষ্ঠানে একযোগে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে চালু করা হবে। প্রস্তাবিত এই মডেলে সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিন অনলাইন এবং বাকি দিনগুলো অফলাইনে ক্লাস পরিচালিত হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক উপস্থিতি কমবে, যানবাহনের চাপ হ্রাস পাবে এবং জ্বালানির ব্যবহারও কমবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা পাঠক্রমের ধারাবাহিকতার মধ্যেই থাকবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, রাজধানীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত গাড়িতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে, যা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি অপচয় এবং যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। করোনাকালে হঠাৎ করেই অনলাইন শিক্ষায় অভ্যস্ত হতে হয়েছিল, তবে ভবিষ্যতের জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি।
শিক্ষকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, অনলাইন ক্লাস কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, সে বিষয়েও নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি উল্লেখ করেন, সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা নির্ধারণ, অফিস সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা ইত্যাদি। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ এবং বৈদ্যুতিক পরিবহনের ব্যবহার বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সবশেষে মন্ত্রী বলেন, নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং পরীক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
Leave a Reply