ইরান-ইসরায়েল সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিক্ষা খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি অফিস দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রাখার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় আসছে। বিকল্প হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনাও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, টানা প্রায় ৪০ দিনের ছুটি শেষে আগামীকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার কথা থাকলেও উদ্ভূত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের সংকট যদি প্রকট আকার ধারণ করে, তাহলে পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও আসতে পারে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই দেশের বিভিন্ন জ্বালানি পাম্পে তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতে সরকার সেই সীমাবদ্ধতা সাময়িকভাবে তুলে নেয়। এর ফলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও বর্তমানে আবারও জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করেছে। অনেক পাম্পে তেলের পরিমাণ সীমিত থাকলেও বাস্তবে জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের সংকটের প্রভাব দেখা যাচ্ছে এবং কোথাও কোথাও জ্বালানি পাম্প বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ইতোমধ্যেই কিছু দেশে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেছে। যেমন, ভেনেজুয়েলা-তে পরিবহন সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ শুক্রবার (২৭ মার্চ) দেশটির সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সীমিত কার্যক্রম পরিচালনা বা ছুটি পালনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে চাপের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি হিসেবে অস্ট্রেলিয়া-এর নাম উঠে এসেছে। ‘দ্য কোবেইসি লেটার’-এর তথ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দেশটি জরুরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সরকারি কার্যক্রম সীমিত করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ফিলিপাইন-এ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন ব্যবস্থা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। এমনকি শিল্পকারখানাগুলোও উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল মজুত করার চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কোথাও কোথাও তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক চালক এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরেও জ্বালানি পাচ্ছেন না। অধিকাংশ স্টেশনেই ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় এর প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষা খাতেও, বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর খুলতে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে এখনো বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি না হলেও অস্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজ আগমনে বিলম্ব এবং সীমিত মজুত—এসব কারণে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এমন অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, পরিবহন সংকট তীব্র হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ব্যাহত হবে। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে অতীতের COVID-19 pandemic সময়ের মতো আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে অনলাইনে ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অন্যান্য দেশের মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশেও তৈরি হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
Leave a Reply