বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম এবং জাল সনদ শনাক্তের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এই উদ্দেশ্যে সংস্থাটি তাদের জনবল কাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছে এবং সে অনুযায়ী সরকারের কাছে নতুন পদ সৃষ্টির অনুমোদন চেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অনুমোদন পাওয়া গেলে ডিআইএ তাদের কার্যক্রম দ্বিগুণ গতিতে পরিচালনা করতে পারবে এবং বিশেষ করে জাল সনদধারীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হবে।
বর্তমানে ডিআইএর অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী সংস্থাটিতে মোট ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তবে প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় এই সংখ্যা বাড়িয়ে ২৩০ জনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিললে নতুন পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। এতে করে সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত পরিসরে এবং কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডিআইএর পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম জানান, বর্তমান সক্ষমতা সীমিত থাকায় বড় পরিসরে অডিট কার্যক্রম পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, জনবল বাড়ানো গেলে সংস্থাটি আরও বৃহৎ আকারে অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে এবং তাতে অধিক সংখ্যক জাল সনদধারীকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। বর্তমানে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অডিট পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এই সংখ্যা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় ৩৫ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একমাত্র সংস্থা ডিআইএ। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্নীতি, নিয়োগে অসঙ্গতি এবং সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে। এসব অনিয়মের বিষয়ে সুপারিশসহ প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয় এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
তবে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে জাল সনদ তৈরি ও ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ডিআইএ কার্যকর ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি—এমন অভিযোগ রয়েছে। এর পেছনে জনবল সংকটের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে জাল সনদ শনাক্ত হওয়ার পরও ঘুষের বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ডিআইএতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ফাইল পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিপুল সংখ্যক জাল সনদধারীর তথ্য সামনে আসে। বর্তমানে সংস্থাটি তদন্ত করছে—কোন কারণে এবং কারা এই ফাইলগুলো এতদিন ধরে আটকে রেখেছিল।
গত এক বছরে ডিআইএ চার শতাধিক শিক্ষকের জাল ও ভুয়া সনদ শনাক্ত করে তাদের বিস্তারিত তথ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি আরও প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষকের সনদ অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু সনদ জালিয়াতিই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাত হওয়া ৭৯৩ একর জমি উদ্ধারের সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে ভুয়া নিয়োগ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভ্যাট ও আয়কর সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে প্রায় ২৫৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও পরিস্থিতি এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং জাল সনদ দমনে আরও কঠোর ও বিস্তৃত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে ডিআইএ মোট ১ হাজার ১৮৬ জন জাল সনদধারীকে শনাক্ত করেছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে রাজশাহী বিভাগে ৭৭৯ জন, খুলনা বিভাগে ১৭৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪ জন এবং ঢাকা বিভাগে ৭০ জন শনাক্ত হয়েছে। এর বাইরে পুলিশের সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ আরও ১৩৪ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের তালিকা ডিআইএকে সরবরাহ করেছে। একই সময়ে মাদ্রাসা অধিদপ্তর নিজস্ব তদন্তের মাধ্যমে ১২০ জন শিক্ষকের জাল সনদ বাতিল করে তাদের ইনডেক্স নম্বর কর্তন করেছে।
ডিআইএর তদন্তে ধরা পড়া জাল সনদের মধ্যে রয়েছে এনটিআরসিএ শিক্ষক নিবন্ধন সনদ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ, রয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ (নেকটার সনদ) এবং অন্যান্য বিভিন্ন একাডেমিক সনদ। এর মধ্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ ১৪৮টি এবং শিক্ষক নিবন্ধন বা এনটিআরসিএ সনদ ১২০টি। বাকিগুলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সনদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা জাল সনদ ও প্রশাসনিক দুর্নীতির চক্র ভাঙতে ডিআইএ কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করলেও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। কার্যকর নজরদারি, কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ধারাবাহিক অভিযান ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে ডিআইএর পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম আরও বলেন, জাল সনদধারীদের শনাক্ত করতে বৃহৎ পরিসরে অডিট কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যারা জাল সনদের মাধ্যমে চাকরি করছেন, তাদের এখনই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যথায় ভবিষ্যতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যার মধ্যে বেতন ফেরত, মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ডিআইএ কঠোর সতর্কতা জারি করেছে। এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অফিস আদেশ ছাড়া কোনো ধরনের পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে অর্থ দাবি করে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ ডিআইএকে মোবাইল বা ইমেইলের মাধ্যমে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীর পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখা হবে বলেও অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে।
Leave a Reply