দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘র্যাগ ডে’ উদ্যাপনের নামে অশ্লীলতা, নগ্নতা, ডিজে পার্টি ও অশোভন আচরণ বন্ধে আগেই নির্দেশনা দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। ২০২২ সালে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং ও র্যাগ ডে ঘিরে নানা বিতর্ক, সমালোচনা এবং অভিযোগ চলছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল শিক্ষার্থীদের বুলিং, অশালীন আচরণ, ডিজে পার্টির নামে উচ্ছৃঙ্খলতা এবং নানা ধরনের অপসংস্কৃতির চর্চা। এসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এবার একই ধরনের বিশৃঙ্খলা রোধে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। র্যাগ ডে উদ্যাপনের নামে যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে মাউশির আওতাধীন বিভিন্ন অঞ্চলের জেলা ও উপজেলার অধীন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ সংক্রান্ত অগ্রগতির তথ্য চাওয়া হয়েছে।
মাউশি জানিয়েছে, র্যাগ ডে উপলক্ষে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায় থাকে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তার একটি সারসংক্ষেপ প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। এই প্রতিবেদন নির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী প্রস্তুত করে আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে একসাথে কম্পাইল করে পাঠাতে বলা হয়েছে।
শুধু র্যাগ ডে নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইভটিজিং প্রতিরোধ এবং শিক্ষার্থীদের রাতে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য জানতে চেয়েছে মাউশি। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের আচরণগত উন্নয়ন, সামাজিক সচেতনতা এবং নিরাপদ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তারও অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইং থেকে দেশের সব আঞ্চলিক পরিচালক ও আঞ্চলিক উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক) বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে একটি আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রচার-প্রচারণা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যেও বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত মাদকবিরোধী ডকুমেন্ট্রি এবং মাদকবিরোধী থিম সং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রদর্শনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
এছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইভটিজিং প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপ, র্যাগ ডে-এর নামে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে গৃহীত ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের রাতে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে ই-মেইলের মাধ্যমে (director.mew@gmail.com) পাঠাতে হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কর্মকর্তারা তাদের আওতাধীন জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবেন। এরপর সেসব তথ্য একত্রিত করে নির্ধারিত ছক অনুযায়ী একটি সারসংক্ষেপ প্রতিবেদন তৈরি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠাতে হবে।
প্রতিবেদনের জন্য নির্ধারিত ছকে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—অঞ্চলের নাম, ওই অঞ্চলের আওতাধীন মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, প্রতিবেদনের বিষয় বাস্তবায়ন করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের শতকরা হার, বাস্তবায়ন করতে পারেনি এমন প্রতিষ্ঠানের শতকরা হার (যদি থাকে), বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মন্তব্য।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২২ সালের ৩ জুলাই ‘র্যাগ ডে’ উদ্যাপনের নামে বিভিন্ন ধরনের অশোভন আচরণ, অশ্লীলতা, নগ্নতা, ডিজে পার্টি, নিষিদ্ধ ও নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষার্থীদের বুলিং বা উত্ত্যক্ত করা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠায়।
এর আগে ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘র্যাগ ডে’-এর নামে ডিজে পার্টি, উচ্ছৃঙ্খল নৃত্য, বুলিং, অশ্লীলতা ও নগ্নতা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর হাইকোর্ট বিভাগ-এ একটি রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ কামরুল হাসান।
পরে ওই রিটের শুনানি শেষে ১৭ এপ্রিল হাইকোর্ট ৩০ দিনের মধ্যে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘র্যাগ ডে’-এর নামে বুলিং, নগ্নতা এবং অপসংস্কৃতি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের ওই নির্দেশনার আলোকে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
Leave a Reply