দশক দুয়েক আগে যেন সময়ের ভাঁজে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। দীর্ঘদিনের ব্যবধানের পর সেই ভাঁজ খুলে আবার শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা ও সমস্যাগুলো সামনে আসছে। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, ধুলোর ছাপ জমেছে—but পরিচিত দপ্তর, করিডোর এবং অনেক মুখ আজও আগের মতোই। তবে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। এই মুহূর্তে শিক্ষামন্ত্রীর পদক্ষেপে রয়েছে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার ভার, কথায় প্রতিফলিত হচ্ছে পূর্বের দায়বদ্ধতার সুর। যেন অতীতের অসমাপ্ত কাজগুলো নতুন সময়ের প্রেক্ষাপটে পূর্ণ করার চেষ্টা করছে। পরিচিত পরিসরে ফিরে এসে তিনি স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে দীর্ঘ বিরতির পরও শিক্ষাব্যবস্থা নতুনভাবে গুছিয়ে দাঁড় করানোর লক্ষ্য তার আগের মতই অটল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই তিনি শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আশাব্যঞ্জক বার্তা প্রদান করেছেন। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম কর্মদিবসের সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তিনি খোলামেলা আলোচনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে তিনি নানা উদ্যোগ নেবেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গণমাধ্যমের সামনে এসে তিনি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। এই পরিকল্পনায় প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং আধুনিক, শিক্ষাবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার প্রতিফলন স্পষ্ট।
শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে জানান, শিক্ষা প্রশাসনে বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তের আশ্বাস তিনি দিয়েছেন। পাশাপাশি শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলি প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে সফটওয়্যারভিত্তিক ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন।
শিক্ষক নেতা রাশেদ মোশাররফ মন্তব্য করেন, “স্কুল-কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসার ছুটি নিয়ে যে অসন্তোষ ছিল, প্রথম কর্মদিবসেই সেটি দূর করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। আমরা এমন শিক্ষামন্ত্রী চাই, যিনি শুধু সমস্যা জানবেন না, তা সমাধান করবেন।”
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন দেশের শিক্ষা খাতের বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা—যেমন প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠে ফেরানো, শিক্ষকদের বেতন ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধি, নির্ধারিত সময়ে বেতন প্রদান এবং বদলি প্রক্রিয়া কার্যকর করা—সমাধানে সমন্বিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এই বাস্তবমুখী উদ্যোগ শিক্ষকদের মধ্যে ইতোমধ্যেই আশার সঞ্চার করেছে।
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা পান। শিক্ষামন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, এবার এই ভাতা শতভাগ প্রদানের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা বিষয়টি আমার জানা আছে, এবার এটা বাস্তবায়ন করা হবে।”
নির্বাচনের আগে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “যেকোনো ধরণের অনিয়ম বা ঘুষবাণিজ্য ঘটেছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে এবং শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।”
শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষকদের নামমাত্র বেতনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “এটি আমরা জানি এবং সমাধান করার পরিকল্পনা করছি। শিক্ষকদের বদলি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আর থাকবে না; কার্যক্রম ডিজিটালভিত্তিক করা হবে এবং শিক্ষার্থীদের সময়মত মানসম্মত বই বিতরণ নিশ্চিত করা হবে।”
শিক্ষামন্ত্রী জানান, কারিকুলাম চেঞ্জ নয়, বরং রিভিউ করা হবে। পাশাপাশি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলোকে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আগে আমাদের সময়ে শিক্ষার নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি। এবার আমরা এটি কার্যকর করব।”
১) বাজেট বৃদ্ধি: জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
২) উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন: খরচের গুণগত মান বাড়িয়ে প্রকল্প মাইলস্টোনভিত্তিক করা হবে।
৩) উন্নয়ন ব্যয় অগ্রাধিকার: শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, ভাষা ল্যাব, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং স্কুল অবকাঠামোর উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
৪) ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব: শিক্ষণ-শিখনের জন্য পেডাগজি-ভিত্তিক ডিভাইস কার্যক্রম।
৫) তৃতীয় ভাষা শিক্ষা: বাংলা ও ইংরেজি ছাড়াও পর্যায়ক্রমে আরবি, চীনা, জাপানি, ফরাসি শেখানো হবে।
৬) বিজ্ঞান, কোডিং, রোবোটিক্স: মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা এবং রোবটিক্স কর্নার প্রতিষ্ঠা।
৭) মাধ্যমিকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক: ক্রীড়া ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশের জন্য।
৮) লার্নিং ট্রাজেক্টরি ও কনসেপ্ট ম্যাপ প্রকাশ: শেখার ফলাফলের উপর জোর দিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরি।
৯) প্লুরালিজম, স্ট্যান্ডার্ড এক: সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম শিক্ষাগত মানদণ্ড নিশ্চিত।
১০) কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার ক্রেডিট ব্রিজ: মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি।
১১) উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ইনোভেশন গ্র্যান্ট: গবেষণা, উদ্ভাবন এবং স্টুডেন্ট লোন সহায়তা।
১২) জবাবদিহিতা: প্রকল্প থেকে ক্লাস পর্যন্ত সকল কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, মাসিক পাবলিক ড্যাশবোর্ড ও ট্র্যাকিং সিস্টেম।
শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সমন্বয়ে প্রথম ধাপে ডায়াগনস্টিক রিভিউ, উন্নয়ন বাজেট রুট-কজ অ্যানালাইসিস, শিক্ষক ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ও ভাষা শিক্ষা পাইলট ডিজাইন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদনে জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ ঘোষণা এবং তৃতীয় ধাপে পরীক্ষা ও মূল্যায়নে বড় প্রযুক্তিগত সংস্কার এবং গবেষণা ও উদ্ভাবন সম্প্রসারণ করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের এই বাস্তবমুখী ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য আশা জাগাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মে জর্জরিত শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন ও উন্নয়নের পথে ফিরিয়ে আনতে এটি কার্যকর নেতৃত্বের একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
Leave a Reply