আ ন ম এহসানুল হক মিলন সম্প্রতি সচিবালয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বেসরকারি শিক্ষকদের স্বল্প বেতনের বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন—“অপেক্ষা করুন এবং দেখুন আমরা কী করতে যাচ্ছি।” তাঁর এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য নতুন কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের অনেকেই কর্মজীবন শুরু করেন খুবই সীমিত বেতনে। একজন সহকারী শিক্ষক বহু ক্ষেত্রে ১২-১৬ হাজার টাকার মধ্যে চাকরি শুরু করেন, যা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে তাঁদের জীবনযাপন হয়ে উঠেছে কঠিন।
শিক্ষকতা পেশা একটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ গঠনের মূল ভিত্তি। অথচ এই ভিত্তিকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা করা হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা। ফলে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে অনাগ্রহী হচ্ছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষার জন্য বড় হুমকি। এই হতাশার ধারাবাহিকতার যদি পরিবর্তন না ঘটে তাহলে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দিন দিন স্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে পারে।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্বীকার করেছেন যে বেসরকারি শিক্ষকদের স্বল্প বেতন একটি বাস্তব সমস্যা—“সেটা আপনিও জানেন, আমিও জানি।” অর্থাৎ সরকার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সাধারণত ‘কালচারাল মাইন্ডের’ মানুষদের দেওয়া হয়, কিন্তু সংস্কৃতির সংজ্ঞা কেবল নাচ-গান বা নাটক নয়; বরং শিক্ষাই একটি জাতির মৌলিক সাংস্কৃতিক ভিত্তি।
এই বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন ফুটে ওঠে—শিক্ষাকে যদি সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরা হয়, তাহলে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোই হবে প্রকৃত সাংস্কৃতিক উন্নয়ন।
বাংলাদেশে মোট জাতীয় বাজেটের একটি তুলনামূলক ছোট অংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের জিডিপির কমপক্ষে ৪-৬% শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে তা প্রায়ই ২% এর আশেপাশে ঘোরাফেরা করে।
মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, পার্শ্ববর্তী দেশ যেমন নেপাল ও শ্রীলঙ্কা—তাদের তুলনায়ও বাংলাদেশের শিক্ষা বরাদ্দ কম। অথচ জনসংখ্যা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক বড়।
যদি শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ না বাড়ানো হয়, তাহলে—
একটি রাষ্ট্রের প্রথম ১০-২০ বছর খাদ্য ও নিরাপত্তা খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যদি শিক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না পায়, তাহলে তা উন্নয়নের ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশ্বব্যাপী যেসব দেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছে—তারা প্রথমেই শিক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বা ফিনল্যান্ডের উদাহরণ প্রমাণ করে, শিক্ষককে মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা দিলে পুরো জাতি লাভবান হয়।
সরকার যদি সত্যিই পরিবর্তন আনতে চায়, তাহলে কয়েকটি পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে—
মন্ত্রী বলেছেন—“লেটস ওয়েট অ্যান্ড সি।” কিন্তু শিক্ষকদের জন্য সময় যেন থেমে থাকে না। প্রতিদিনের বাজারদর, পরিবার ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তাঁদের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য করছে।
শিক্ষা যদি সত্যিই জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করতে হবে এখনই। শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কারণ একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না—তিনি একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন।
সময়ের দাবি—শিক্ষকদের মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
Leave a Reply