রমজান মাসে মাধ্যমিক বিদ্যালয় খোলা থাকবে নাকি ছুটি ঘোষণা করা হবে—এ প্রশ্নটি প্রতিবছরই অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়। চলতি বছরও বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এ নিয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করায় আলোচনায় গতি পেয়েছে।
মাউশি জানিয়েছে, রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে কিনা—সে বিষয়ে সরকারিভাবে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেটিই অনুসরণ করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিকট তারা এ বিষয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলো আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনার জন্য করণীয় জানতে চেয়ে পত্র পাঠায়। এর পর এ বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ থাকলে তা পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আজ সোমবার মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় মিটিংয়ে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। অর্থাৎ, শুধুমাত্র আবেগ বা সামাজিক চাপে নয়; বরং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও নীতিগত কাঠামোর মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে তারা।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই রমজান মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা বা আংশিক ছুটি দেওয়ার প্রথা রয়েছে। অনেক সময় পুরো মাস ছুটি না দিয়ে কম সময় ক্লাস নেওয়া হয়। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষার সময়সূচি ও পাঠ্যক্রমের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উপরের বাস্তব চিত্রগুলোই দেখায়—বিদ্যালয় কেবল পাঠদানের স্থান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রও। তাই দীর্ঘ ছুটি দিলে তার প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক শিক্ষার ওপর।
পুরো রমজান মাসে সরকারি-বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এ নির্দেশনা বিরুদ্ধে আপিল করেছে সরকার। আপিলের শুনানি হওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এ তথ্য জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নান।
মাউশি ডিজি জানান, ‘হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দিয়েছে তার বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। আজ সোমবার এ আপিল করা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার আপিলের শুনানির পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে। স্কুল বন্ধ থাকবে না খোলা রাখা হবে সেটি আগামীকাল বোঝা যাবে। শুনানি শেষে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে।’
এর আগে গতকাল রবিবার দুপুরে বিচারপতি ফাহমিদা ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ পুরো রমজান মাসে সরকারি-বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. ইলিয়াস আলী মন্ডল, অ্যাডভোকেট তানজিনা ববি লিজা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এই নোটিশ পাঠান তিনি।
ছুটির পক্ষে যুক্তি:
রমজানে শিক্ষার্থীরা রোজা রাখে, ফলে দীর্ঘ সময় ক্লাস করলে শারীরিক ক্লান্তি আসতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যাতায়াতের কষ্ট থাকলে তা আরও বেশি অনুভূত হয়। তাই অনেকেই পূর্ণ ছুটির পক্ষে মত দেন।
ছুটির বিপক্ষে যুক্তি:
অন্যদিকে, শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত পাঠসূচি সম্পন্ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত ছুটি দিলে পাঠ্যসূচি শেষ করতে সমস্যা হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও রমজানে বিদ্যালয় পুরোপুরি বন্ধ থাকে না; বরং সময় কমিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা হয়।
মাউশি স্পষ্ট করেছে যে, শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা তাদের প্রধান দায়িত্ব। আদালতের নির্দেশনা বা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া তারা স্বতন্ত্রভাবে কোনো সিদ্ধান্ত দেবে না। এ থেকে বোঝা যায়—প্রশাসন চায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান, যাতে ধর্মীয় অনুভূতি ও শিক্ষার মান—দুই-ই রক্ষা পায়।
১. পূর্ণ ছুটির পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত সময়সূচি চালু করা।
২. পরীক্ষার রুটিন রমজানের আগে বা পরে সমন্বয় করা।
৩. অনলাইন বা অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক পাঠদান বাড়ানো।
৪. শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনায় নমনীয় উপস্থিতি নীতি প্রণয়ন।
রমজানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছুটি প্রসঙ্গটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ধর্মীয় চর্চা, শিক্ষার মান, সামাজিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় নীতির একটি সমন্বিত বিষয়। মাউশির বক্তব্য থেকে পরিষ্কার—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে এলেই তা কার্যকর হবে। তাই অযথা বিভ্রান্ত না হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—যে সিদ্ধান্তই আসুক, তা যেন শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকে সামনে রেখে নেওয়া হয়।
batennoakhali39@gmail.com