নবম জাতীয় পে কমিশনের দাখিলকৃত সুপারিশের আলোকে সরকার কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যের বাস্তবায়ন কমিটি যে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর প্রতি নীতিগত সম্মতি দিয়েছে, তা সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দৈনিক যুগান্তর (২৯ জানুয়ারি ২০২৬)–এ প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০ গ্রেড থেকে ১ম গ্রেড পর্যন্ত নতুন বেতনের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো সামনে এসেছে, যা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও দাবির প্রতিফলন।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ২০ গ্রেডের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬,০০০ টাকা, যা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯ গ্রেডে ১৬,৪০০ টাকা, ১৮ গ্রেডে ১৭,০০০ টাকা এবং ১৭ গ্রেডে ১৭,৩০০ টাকায় পৌঁছেছে। নিম্ন গ্রেডের এই বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে এটিকে একটি ইতিবাচক সূচনা বলা যায়। বিশেষ করে ১৬ গ্রেডে ১৭,৮০০ টাকা এবং ১৫ গ্রেডে ১৮,২০০ টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।
মধ্যম গ্রেডগুলোতে বেতনের বৃদ্ধি আরও স্পষ্ট। ১৪ গ্রেডে ১৮,৫০০ টাকা, ১৩ গ্রেডে ১৯,১০০ টাকা এবং ১২ গ্রেডে ১৯,৮০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। ১১ গ্রেডে বেতন এক লাফে ২৫,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যম স্তরের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি করে। এই স্তর থেকেই মূলত প্রশাসনিক দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা বাড়তে থাকে, ফলে বেতনের এই বৃদ্ধি কাঠামোগতভাবে যৌক্তিক বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
উচ্চতর গ্রেডগুলোতে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো আরও শক্তিশালী। ১০ গ্রেডে ৩২,০০০ টাকা, ৯ম গ্রেডে ৪৪,০০০ টাকা এবং ৮ম গ্রেডে ৪৮,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭ম গ্রেড (ডি)–তে ৫১,০০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৬৬,০০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করা হচ্ছে। এই ধাপগুলোতে বেতন ব্যবধান তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় পদোন্নতি ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে এটি একটি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করতে পারে।
সবচেয়ে উচ্চ গ্রেডগুলোতে বেতন কাঠামো আরও সুস্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫ম গ্রেডে ৭২,০০০ টাকা, ৪র্থ গ্রেডে ৮১,০০০ টাকা এবং ৩য় গ্রেডে ৮৮,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২য় গ্রেডে প্রস্তাবিত বেতন ১,০৭,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডে ১,৩৮,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের এই ব্যবধান নবম পে কমিশনের ঘোষিত ১:৮ অনুপাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা পূর্ববর্তী পে স্কেলের তুলনায় বৈষম্য কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোতে স্থিতিশীলতা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই বেতন কাঠামোর সঙ্গে ভাতা, উৎসব ভাতা, বাসাভাড়া ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে সমন্বয় করা হবে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সরকার কত দ্রুত গেজেট প্রকাশ করতে পারবে। বাস্তবায়ন কমিটির সম্মতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপন ছাড়া কর্মচারীদের প্রত্যাশা পূর্ণতা পাবে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নবম জাতীয় পে কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তিন সদস্যের বাস্তবায়ন কমিটির এই সম্মতি সরকারি বেতন কাঠামো সংস্কারের পথে একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি। এখন সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন, গেজেট প্রকাশ ও দ্রুত বাস্তবায়নের দিকেই সবার দৃষ্টি।
Leave a Reply