নবম জাতীয় বেতন কমিশন নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই তাদের সুপারিশ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে, যা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। ২৩ সদস্যের এই কমিশন কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২১ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা নতুন পে স্কেল বিষয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এখন মূল অপেক্ষা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হয়, সে দিকেই সবার দৃষ্টি।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, পে স্কেল ঘোষণার পর তা কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগে। অষ্টম জাতীয় পে স্কেলের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছে। সে সময় ২০১৫ সালের ১৩ মে পে কমিশনের সুপারিশ জমা দেওয়ার পর প্রায় সাড়ে সাত মাস পর, ১৫ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তা কার্যকর করা হয়। যদিও বাস্তবায়নের তারিখ ধরা হয়েছিল আগের বছরের ১ জুলাই থেকে, ফলে চাকরিজীবীরা একসঙ্গে বকেয়া বেতন পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই অনেকেই মনে করছেন, নবম পে স্কেল ঘোষণার পরও গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়নে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
অষ্টম পে স্কেলের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন ১৬ ধাপে বেতন কাঠামোর সুপারিশ করেছিল। সেখানে সর্বোচ্চ বেতন প্রস্তাব করা হয়েছিল ৮০ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২০০ টাকা। তবে গেজেট প্রকাশের সময় তা সামান্য পরিবর্তিত হয়ে সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার এবং সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা নির্ধারিত হয়। সে সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত কম বেতনের কর্মচারীদের স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন কাঠামো নির্ধারণের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
নবম পে স্কেলের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো আগের তুলনায় আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যেখানে বেতন অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে ১:৮। এটি বাংলাদেশের বেতন কমিশনের ইতিহাসে সর্বনিম্ন অনুপাত। উল্লেখযোগ্যভাবে, প্রথম বেতন কমিশন (১৯৭৩)–এ এই অনুপাত ছিল ১:১৫.৪ এবং সর্বশেষ অষ্টম বেতন কমিশনে (২০১৫) ছিল ১:৯.৪। বর্তমান কমিশনের এই কম অনুপাত বৈষম্য কমানোর একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করে। দীর্ঘ ১২ বছর পর গঠিত এই কমিশনের জন্য নির্ধারিত শেষ সময় ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। কিন্তু কমিশন নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করার পাশাপাশি বরাদ্দকৃত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয় করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে, যা তাদের কার্যকারিতা ও দক্ষতারই প্রতিফলন। এখন সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা, অতীতের মতো দীর্ঘসূত্রতা না রেখে সরকার দ্রুত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোবে।
Leave a Reply