নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোট ২০টি গ্রেডে নতুন বেতন কাঠামো সুপারিশ করেছে। এবার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান কমিয়ে অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে ১:৮, যেখানে আগে এই অনুপাত ছিল ১:৯.৪। এর ফলে বর্তমানে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থাকা সর্বনিম্ন বেতন বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং ৭৮ হাজার টাকা থাকা সর্বোচ্চ বেতন বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছেন, এই সুপারিশগুলো কার্যকর করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, গত দশ বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে কমিশন অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে মোট ১৮৪টি সভা আয়োজন করে এবং ২ হাজার ৫৫২ জন অংশীজনের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রণয়ন করেছে।
নবম পে-স্কেল কবে থেকে কার্যকর হতে পারে?
কমিশনের প্রতিবেদন ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন সরকার একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করবে। কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনার পর গেজেট প্রকাশ হলে নবম পে-স্কেল কার্যকর হবে।
নবম বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন কত প্রস্তাব করা হয়েছে?
২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ বেতন কত নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে?
১ম গ্রেডে সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
টিফিন ভাতা কতটা বাড়ানো হচ্ছে?
১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা কি বাধ্যতামূলক হচ্ছে?
কমিশন প্রথমবারের মতো সকল সরকারি কর্মচারীর জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর জোরালো সুপারিশ করেছে।
বেতন বৃদ্ধির হার কত হতে পারে?
গ্রেডভেদে মূল বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে কি আলাদা ভাতা মিলবে?
প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে—এমন কর্মচারীরা সন্তানপ্রতি মাসে ২ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। সর্বোচ্চ দুই সন্তান পর্যন্ত এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে।
পেনশনভোগীরা কি নতুন স্কেলের সুবিধা পাবেন?
হ্যাঁ, প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কতটা বাড়তে পারে?
প্রাথমিক শিক্ষকদের বর্তমান গ্রেড অনুযায়ী নতুন স্কেলে উল্লেখযোগ্য বেতন বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণস্বরূপ, ১৩তম গ্রেডে মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২৪ হাজার টাকা হতে পারে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বিষয়ে কোন সুপারিশ রয়েছে কি কমিশনের রিপোর্টে?
না এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বিষয়ে বর্তমান পে কমিশনের রিপোর্টে আলাদা কোন সুপারিশ নাই। আর থাকার কথা নয় কারণ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা জাতীয় স্কেলের আওতাভুক্ত হলেও তাদের বিষয়ে কোন সুপারিশ নেই। কারণ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন বাবদ যে ভাতা পায় তা সরকারের রাজস্ব খাত হতে প্রদান করা হয় না। এটি প্রদান করা হয় সরকারের উন্নয়ন ও অনুদান তহবিল হতে বিধায় তাদের জন্য কোন আলাদা সুপারিশ থাকার কথা নয়। তবে তারা আশা করা যায় অতীতের ন্যায় নতুন পে স্কেলের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য যে আলাদা কোন সুপারিশ থাকবে না তা এই পে কমিশন জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সাথে মিটিংয়ে বলে দিয়েছেন।
নতুন পে-স্কেলে গ্রেড সংখ্যা কি কমানো হয়েছে?
না, বর্তমানে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে গ্রেডগুলোর মধ্যে বেতনের বৈষম্য কমানো হয়েছে।
বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট কি আগের মতোই থাকবে?
মূল বেতন বাড়ার ফলে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টের টাকার অঙ্কও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। ইনক্রিমেন্টের হার বাস্তবায়ন কমিটি চূড়ান্ত করবে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে মোট ব্যয় কত?
এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।
১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য বিশেষ সুবিধা কী?
এই গ্রেডগুলোর ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে এবং টিফিন ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনী ও বিচার বিভাগের জন্য কি আলাদা কমিশন হবে?
বেসামরিক কর্মচারীদের প্রতিবেদন জমার পর সশস্ত্র বাহিনী ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সচিবদের বেতন কি ২০ গ্রেডের বাইরে নির্ধারণ হবে?
প্রতিবেদনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য ২০ ধাপের বাইরে একটি বিশেষ ধাপ তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রস্তাব এসেছে। প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে সন্তানপ্রতি ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে ১:৮। এই স্কেল বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ১.০৬ লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
নতুন পে-স্কেলে টিফিন ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা, প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা ছাড়াও যাতায়াত ভাতা ও ধোলাই ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা মূল বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি একাধিক কাঠামোগত ও সৃজনশীল সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সার্ভিস কমিশন গঠন, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, বেতন গ্রেডের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে আলাদা কমিটি গঠন।
তথ্য অনুযায়ী, সরকার গত ২৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়। নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, তবে কমিশন নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয় করে সময়ের আগেই প্রতিবেদন জমা দিতে সক্ষম হয়।
প্রতিবেদন জমার সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, এখন মূল কাজ হলো এই সুপারিশগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া। সে লক্ষ্যে শিগগিরই একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হবে, যা পে-স্কেল কার্যকরের পদ্ধতি ও সময়সূচি নির্ধারণ করবে।
Leave a Reply