নতুন জাতীয় পে স্কেলকে ঘিরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন কি না—এই প্রশ্নটি বর্তমানে শিক্ষা খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি আলোচনার বিষয়। কারণ এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অধীনে বেতন পেলেও তারা সরাসরি সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা পান না। ফলে অতীতের মতো নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও যদি তাদের বিষয়টি আলাদাভাবে বা সীমিতভাবে বিবেচনা করা হয়, তবে বৈষম্যের আশঙ্কা অমূলক নয়। কারণ বিভিন্ন মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত খবরে যা জানা যাচ্ছে তা হলো-
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানা গেছে। বর্তমানে দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এছাড়া নতুন বেতন কাঠামো বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যদিও তাদের বেতন সরাসরি সরকারি বাজেট থেকে দেওয়া হয় না।
তাহলে এদেশের যে এমপিওভুক্ত পেশায় দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী কর্মরত রয়েছে তাদের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে না কেন? ব্যাংকিং খাত স্বায়ত্বসাশিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের কথা উল্লেখ করতে তাদের অসুবিধা কোথায়? যা কিন্তু সন্দেহের সৃষ্টি করে।
বাস্তবতা হলো, প্রতিটি জাতীয় পে স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্পষ্ট কাঠামো, গ্রেডভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা ও ভাতার পূর্ণাঙ্গ তালিকা নির্ধারণ করা হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তা অনেক সময় আংশিক বা শর্তসাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয়। নতুন পে স্কেলেও যদি মূল বেতন বাড়লেও অন্যান্য ভাতা, পদোন্নতির সুযোগ, টাইম স্কেল বা নির্বাচন গ্রেডে সমতা না আসে, তবে তা কার্যত বেতন কাঠামোর ভেতরেই একটি কাঠামোগত বৈষম্য তৈরি করবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নতুন পে স্কেলে বাস্তবায়নের সময়কাল বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নানামুখি টালবাহানা করতে দেখা গিয়েছে। তাহলে এবারও কি সেদিকেই যাচ্ছে এদেশের সরকার ব্যবস্থা। সাধারণত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তারিখ থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে পে স্কেল কার্যকর হয়। কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অর্থ ছাড়, প্রশাসনিক জটিলতা ও আলাদা প্রজ্ঞাপনের কারণে বিলম্ব ঘটে। তবে অতীতের পুরাতন ব্যবস্থায় যদি সরকার এবারও পূনারাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করে তাহলে এর কোন ভাল কিছু বয়ে আনবে বলে মনে হয়না কারণ অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা অনেক বেশি সংঘবদ্ধ। এর ফলে একই সময়ে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও বার বার তারা বৈষম্য়ের স্বীকার হতে চাইবে না। এমনিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা নানা ভাবে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তি থেকে নানা সময়ে পিছিয়ে পড়েন, যা বৈষম্যকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। আর নতুন করে কোন আশ্বাসে আবার নতুন করে পিছিয়ে পড়তে চায় না এদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজ।
তবে এটাও সত্য যে সরকার ধীরে ধীরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং নতুন পে স্কেল প্রণয়নের আলোচনায় তাদের বিষয়টি যে উপেক্ষিত ছিল তা নয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিনিধিদেরও পে কমিশন মতামতের জন্য আমন্ত্রণ করেছিল। যদিও সেখানে ডেকে নিয়ে গিয়ে অপমান করেছে নাকি মতামত গ্রহণ করেছে তা নিয়ে প্রশ্ন করাই যায়। যদি নতুন পে স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য স্পষ্ট গ্রেড ম্যাপিং, সমতাভিত্তিক ভাতা কাঠামো এবং সময়মতো অথ্যাৎ সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের ন্যায় একই সময়ে বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা না দেওয়া যায় কোন প্রকার টালবাহানা করা হয়, তাহলে এই পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে তা সরকার কল্পনাও করতে পারবে না। সরকার যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে এই বৈষম্যেকে উসকে দেয় তাহলে তার দায়ভার সরকারকেই বহন করতে হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নতুন পে স্কেলে বৈষম্যের শিকার হবেন কি না—তা নির্ভর করছে পে স্কেল চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। সরকার যদি “সমান কাজের জন্য সমান মর্যাদা ও সুযোগ” নীতিকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে নতুন পে স্কেল এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য বৈষম্যের নয়, বরং ন্যায্যতার একটি সুযোগ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
Leave a Reply