বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধান, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগকে এনটিআরসিএর আওতায় আনার সিদ্ধান্তটি মূলত দীর্ঘদিনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের দাপট থেকে মুক্ত করার একটি নীতিগত প্রয়াস। অতীতে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও অভিযোগ ছিল—যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য, আর্থিক সক্ষমতা বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষ নেতৃত্বের ঘাটতিতে পড়ত, প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হতো এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এই বাস্তবতা বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে কেন্দ্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থায় যাওয়ার পথে এগিয়েছে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে জবাবদিহি ও মানোন্নয়নের একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে নীতিমালা বাস্তবায়নের পথে যে চ্যালেঞ্জগুলো সামনে এসেছে, সেগুলিও উপেক্ষা করা যায় না। আদালতে দায়ের করা রিট, দেওয়া নির্দেশনা এবং তার বিরুদ্ধে আপিলের প্রক্রিয়া — এসব আইনি জটিলতা নিয়োগযাত্রাকে ধীরগতি করে দিচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে সংবেদনশীল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক। কারণ নির্বাচনের আগে এ ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হলে রাজনৈতিক অপব্যাখ্যা, মাঠপর্যায়ে বিরোধ বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা—এসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফল হিসেবে নীতিমালা পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, নির্বাচনের পর স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এ প্রক্রিয়া শুরু হলে তা আরও স্বচ্ছ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হতে পারে।
নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাছাই পরীক্ষাভিত্তিক নিয়োগ। এতে ধারণা করা হচ্ছে, নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এক ধরণের একাডেমিক ও প্রশাসনিক মানদণ্ড তৈরি হবে। তবে এখনো নির্ধারিত হয়নি পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো—কত নম্বরের লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা হবে, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ কত নম্বরে মূল্যায়িত হবে, ন্যূনতম যোগ্যতা কী হবে — এসব চূড়ান্ত করতে হবে এনটিআরসিএ বোর্ডকে। যদি এই মূল্যায়নপ্রক্রিয়া বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাজানো হয়, যেমন—প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, নীতিনৈতিকতা, শিক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গি ও দক্ষতা মূল্যায়নের পৃথক সূচক যুক্ত করা যায়, তবে তা প্রার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের ভূমিকা কেবল প্রশাসনিক নয় — তিনি একজন নীতি নির্ধারক, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি-গঠনের নেতা, শিক্ষক মণ্ডলীর সমন্বয়কারী এবং শিক্ষার্থীদের উন্নয়নযাত্রার পথপ্রদর্শক। তাই এই পদে নিয়োগ শুধু একটি চাকরি প্রদান নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যতের দিকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা। সে কারণে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা জরুরি। যদি এটি কেবল প্রক্রিয়া পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকে এবং মাঠপর্যায়ে পুরনো প্রভাবশালী মহলের প্রভাব ফিরে আসে, তবে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবে রূপ নেবে না।
অতএব, এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন—আইনি বিষয়গুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তি, নীতিমালার স্পষ্ট কাঠামো প্রণয়ন, অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং প্রার্থীদের জন্য সুসংহত নির্দেশনা নিশ্চিত করা। নীতিমালা যদি সময় নিয়ে হলেও পূর্ণাঙ্গতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে, তবে এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
Leave a Reply