অন্তর্বর্তী সরকার বেসরকারি স্কুল–কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় বেশ কিছু যুগোপযোগী, কাঠামোগত এবং প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা নতুন নীতিমালায় একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানের হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, কোটাব্যবস্থা এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বিস্তারিত ও কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমত, নতুন নীতিমালায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে—কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক–কর্মচারীদের নিকটবর্তী সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদের সঙ্গে ‘সমন্বয়’ করার বিধান। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও শিক্ষক চাকরি হারাবেন না; শিক্ষা মন্ত্রণালয় অফিস আদেশ দিয়ে তাদের অন্য প্রতিষ্ঠানে সমন্বয় করবে। এতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও মানবিক সমস্যা দূর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো।
দ্বিতীয়ত, পূর্বের পাস–কোর্স অধিভুক্ত কলেজগুলোতে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শূন্য পদে সমন্বয়ের বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। ২০১৬ সালের পূর্ববর্তী বিধি মোতাবেক প্যাটার্নভুক্ত পদে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা একই প্রতিষ্ঠানের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে সমন্বয়ের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত হতে পারবেন। তবে সহায়ক ও নিম্নপদে কেবল এসএসসি বা দাখিল/সমমানধারীদেরই সমন্বয়ের জন্য বিবেচনা করার নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, অনগ্রসর, দুর্গম, হাওড়–বাঁওড় বা চরাঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কোটাব্যবস্থা পুনঃনির্ধারণ করতে পারে মন্ত্রণালয়—এমন ক্ষমতা রাখা হয়েছে। ফলে বিশেষ অঞ্চলের শিক্ষকদের নিয়োগ, এমপিও ও পদোন্নতিতে আলাদা সুবিধা চালুর পথ উন্মুক্ত রইল।
চতুর্থত, সরকার যখন কোনো বিষয়ের গুরুত্বকে ‘আবশ্যিক’ ঘোষণা করবে—সেই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্যাটার্নভুক্ত পদের অংশ হবে। বিধি মোতাবেক যিনি নিয়োগ পাবেন, তিনিই নতুন আবশ্যিক বিষয়ের এমপিও সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ পাঠ্যক্রমে নতুন পরিবর্তন এলে প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষকসংখ্যা ও এমপিওস্বীকৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
পঞ্চমত, এনটিআরসিএ নিবন্ধনকে বাধ্যতামূলক করে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও কঠোরতা আনা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে—বিধি মোতাবেক নিয়োগপ্রাপ্ত এবং কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকই এমপিও সুবিধার আওতায় আসবেন। পূর্বনিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ যদি অভিজ্ঞতায় ঘাটতিতে থাকেন, তবে তারা সাময়িকভাবে এক ধাপ নিচের স্কেলে বেতন পাবেন; অভিজ্ঞতা পূরণ হলে পূর্ণ স্কেল প্রাপ্য হবেন। তবে নতুন নীতিমালা জারি হওয়ার পর আর কোনো যোগ্যতাহীন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
ষষ্ঠত, বিএড/বিএমএড ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে ৫ বছরের নিয়ম স্পষ্ট করা হয়েছে। যেসব এমপিওভুক্ত শিক্ষক শিক্ষাগত ডিগ্রিবিহীন—তাদের যোগদানের ৫ বছরের মধ্যে সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। সফলভাবে ডিগ্রি অর্জন করলে তারা গ্রেড-১০ সুবিধা পাবেন, তবে এটি হবে অতিরিক্ত সুবিধা—উচ্চতর স্কেল হিসেবে গণ্য হবে না। জনবল কাঠামো জারির আগেই যারা ডিগ্রিহীন ছিলেন তাদেরও ৫ বছরের সময়সীমার মধ্যে ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সপ্তমত, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও অধ্যক্ষ নিয়োগে বড় পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ থাকলে কেউ এ পদে আবেদন করতে পারবেন না। এটি আগের নীতিমালার তুলনায় উল্লেখযোগ্য কঠোরতা, যা যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করবে।
সবশেষে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার আনা হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের এমপিওভুক্ত প্রভাষকরা ৮ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্তিতে ৫০% পদে ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন প্রাপ্তির ভিত্তিতে ‘সহকারী অধ্যাপক’ পদে পদোন্নতি পাবেন। ভগ্নাংশ ০.৫ হলে তা পরবর্তী পূর্ণসংখ্যা হিসেবে ধরা হবে। অন্য প্রভাষকরা ১০ বছর পর ৯ থেকে ৮ গ্রেডে উন্নীত হবেন এবং ১৬ বছর পূর্তিতে সহকারী অধ্যাপক হবেন। সহকারী অধ্যাপক পদের গ্রেড নির্ধারিত হবে গ্রেড-৬—যা পদোন্নতি কাঠামোকে আরও সুস্পষ্ট করেছে।
Leave a Reply