নরসিংদীর শিবপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রথম দিনেই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সোমবার কর্মসূচির প্রথম দিন থেকেই খাবার সরবরাহে বিশৃঙ্খলা, অস্বচ্ছতা এবং দায়িত্বহীনতার চিত্র সামনে আসে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
পুরো উপজেলার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দিনভর অপেক্ষা করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অধিকাংশ বিদ্যালয়ই খাবার পায়নি। শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনা অনুযায়ী আগের দিনই শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে সোমবার থেকে দুধ ও রুটি সরবরাহ শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ১৪২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অনেকগুলোতেই খাবার পৌঁছায়নি, কিছু বিদ্যালয় পেয়েছে দেরিতে, আর যেগুলো পেয়েছে সেগুলোতেও দুটি খাবারের স্থলে কোথাও একটিই দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিতরণ করা খাবারের পরিমাণেও প্রায় ১০ শতাংশ ঘাটতি ছিল। সরবরাহকৃত বনরুটিতে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—স্কুল ফিডিং কর্মসূচির এই খাবার কোন ঠিকাদার দিচ্ছে, কারা পরিবহন করছে বা কারা বিতরণ করছে—এ নিয়ে শিক্ষা অফিস, উপজেলা প্রশাসন কিংবা বিদ্যালয়গুলো কেউই স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি। শিবপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় মোট ১৪২ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ২৩ হাজার ৮৯৩ জন—কিন্তু এত বড় কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার পরিচয়ই অজানা রয়ে গেছে।
শিবপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মাসুদুর রহমান খান জানান, দুটি খাবারের মধ্যে তাদের বিদ্যালয় মাত্র একটি পেয়েছে। খাবার দেরিতে পৌঁছানোয় সকালের শিফটের শিক্ষার্থীরা কিছুই পায়নি। একইভাবে উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আবু হানিফও অভিযোগ করেন যে তাদের বিদ্যালয়ে দুটি আইটেম দেওয়া হলেও সেগুলো ১০ শতাংশ কম ছিল।
ধানুয়া উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক মানিক মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার সন্তানকে দুধ ও রুটি দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে শুধু রুটি। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেন জানান, প্রথম শিফটের শিশু, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কেউ খাবার পায়নি; দ্বিতীয় শিফটের শিক্ষার্থীরা বিকেল তিনটার দিকে একটি খাবার পেয়েছে—সেটিও ১০ শতাংশ কম।
দুলালপুর ইউনিয়নের সাতপাইকা ও গড়বাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা জানান, তাদের ইউনিয়নের কোনো বিদ্যালয়ই খাবার পায়নি, যা তাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের সঙ্গেও কোনো বিদ্যালয় যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. কবিরুল ইসলাম স্বীকার করেন যে ঠিকাদার বা সরবরাহকারী কারা—এ নিয়ে তার দপ্তরের কোনো ধারণা নেই। তিনি জানান, সব বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছায়নি এবং যেগুলো পেয়েছে সেগুলোও যথাসময়ে পায়নি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা: ফারজানা ইয়াসমিনও জানান, স্কুল ফিডিংয়ের খাবার বিতরণ সম্পর্কে তাকে কেউ অবগত করেনি এবং কোনো ঠিকাদার তার সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। তিনি শিক্ষা অফিসারকে দ্রুত বিষয়টি যাচাই করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এই অস্বচ্ছতা, অনিয়ম এবং দায়িত্বহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে শিবপুর জুড়ে প্রশ্ন উঠছে—শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতের জন্য জাতীয় পর্যায়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি কি শুরুতেই দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়ছে?
Leave a Reply