সারা দেশে সাধারণ ও কারিগরি মিলিয়ে দুই হাজার ছয় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে নন–এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা যে প্রত্যাশা ও আন্দোলন করে আসছেন, তাদের দাবিগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে সরকার এমপিও চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়াকে গতিশীল করেছে এবং দ্রুততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিজের দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ড. আবরার এ তথ্য তুলে ধরেন। তার আগে নন–এমপিও ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা উপদেষ্টা নিজেই। বৈঠককে কেন্দ্র করে সচিবালয়ে উপস্থিত ছিল দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্তরের নেতাদের এক বিরল সমাবেশ।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান, গণসংহতি আন্দোলনের আহ্বায়ক জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সহসম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সম্পাদক ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির শিক্ষা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ওমর ফারুক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মো. ফয়সালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা। নন–এমপিও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পটভূমিতে এ বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
বৈঠকে নন–এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তকরণ নীতিমালা, বাস্তবায়ন কৌশল, বাজেট বরাদ্দ, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, যোগ্যতা যাচাই এবং সরকারের চলমান পদক্ষেপ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের নেতারা এ বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, আর্থিক সক্ষমতা ও জাতীয় শিক্ষায় অবদান নির্ধারণে নতুনভাবে কিছু মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যদি সম্মিলিতভাবে ঘোষণা দেয় যে ক্ষমতায় গেলে তারা এমপিও প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখবে এবং শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুবিধা বৃদ্ধি করবে—তাহলে তা দেশব্যাপী শিক্ষক সমাজকে আশ্বস্ত করবে। তিনি বলেন, “আন্দোলনরত শিক্ষকদের ঘরে ফেরাতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যা যা করা প্রয়োজন, সরকার তা করছে। রাজনৈতিক দলগুলো এমন ঘোষণা দিলে বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং শিক্ষকরা ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপদ বোধ করবেন।”
ড. আবরার আরও জানান, চলতি অর্থবছরে নন–এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করার উদ্দেশ্যে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে—বাসাভাড়া বৃদ্ধি, উৎসবভাতা, বোনাস এবং অন্যান্য সুবিধা বাবদ। যেসব প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এমপিওভুক্ত হতে পারেনি বা বিভিন্ন সময় একাধিকবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তাদের আবেদনের বিষয়ও নতুনভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের এমপিও প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও বেশি কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্রিক হবে। দেশের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। তাই ঢালাওভাবে সব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত না করে বরং যারা কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন ঘটাতে পারে, তাদের আগেই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।” তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকেও কারিগরি শিক্ষা বিষয়ে একমত হওয়ার পরামর্শ দেন।
শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে—মন্ত্রিপর্যায়ের উদ্যোগ, রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা এবং নতুন বাজেট পরিকল্পনার মাধ্যমে নন–এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়া এখন নতুন দিকপথে এগোচ্ছে। শিক্ষক সমাজ এ উদ্যোগে নতুন আশার আলো দেখছেন।
Leave a Reply