শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ভেঙে দুটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব ঘিরে শিক্ষাক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বিমুখী বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিচ্ছেন। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মাউশিকে বিভক্ত করার উদ্দেশ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়, বরং অতীতের ন্যায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদ দখলের সুযোগ সৃষ্টি করা। তাদের মতে, শিক্ষাকে বহুমুখীভাবে বিভক্ত না করে বরং একই ছাতার নিচে এনে পর্যাপ্ত জনবল ও পদ বৃদ্ধি করা জরুরি। অন্যদিকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর হলে মাধ্যমিক শিক্ষার গতি বাড়বে এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা মাধ্যমিক শিক্ষকদের বৈষম্য কমে আসবে।
গত ৩ আগস্ট ২০২৫ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, মাউশিকে দুটি আলাদা অধিদপ্তরে রূপান্তর করতে হবে—একটি হবে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং অপরটি হবে ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ (বা কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর)। এই প্রস্তাবনায় ২১ জুলাই তৎকালীন শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুয়াবের স্বাক্ষর করেন এবং ৩১ জুলাই স্বাক্ষর করেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ২৯ আগস্ট, এরপর থেকেই শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকেন। অন্যদিকে, সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে জেলা পর্যায়ে কর্মসূচি পালন করছেন।
বর্তমানে মাউশির অধীনে রয়েছে ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়, ৬৪টি জেলা শিক্ষা অফিস, ৫১৬টি উপজেলা শিক্ষা অফিস, ৬৮৬টি সরকারি কলেজ, ৭০৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১০৪টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এবং একটি উচ্চ মাধ্যমিক টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২১ হাজার ২৩২টি, এর মধ্যে ১ হাজার ৫১৪টি হলো স্কুল-কলেজ। শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা ৯০ লাখের বেশি।
প্রস্তাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যুক্তি দেখিয়েছে, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য মাধ্যমিক শিক্ষা কাঠামো পুনর্বিন্যাস জরুরি। মন্ত্রণালয়ের মতে, এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটবে এবং সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের বৈষম্য হ্রাস পাবে। তবে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা এটিকে অযৌক্তিক ও অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের বক্তব্য, একই রকমভাবে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা করা হলেও গুণগত মান উন্নয়ন হয়নি, বরং সমন্বয়হীনতা বেড়েছে এবং প্রশাসন ক্যাডার পদ দখল করেছে।
মাউশিকে বিভক্ত করার সুপারিশ এসেছে বিয়াম ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে, যা কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি) আয়োজিত একটি জাতীয় কর্মশালা থেকে সংগৃহীত সুপারিশের আলোকে তৈরি হয়। শিক্ষা ক্যাডারদের অভিযোগ, মূল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই এই সুপারিশ করা হয়েছে, যা প্রশাসন ক্যাডারদের প্রভাব বিস্তারের কৌশল ছাড়া কিছু নয়। তারা মনে করছেন, অতীতের মতোই মাধ্যমিক শিক্ষার দায়িত্ব অশিক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হাতে চলে যাবে।
অন্যদিকে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, দেশে প্রায় ২৫ হাজার মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কেন স্বতন্ত্র অধিদপ্তর থাকবে না, সেটিই প্রশ্ন। তাদের দাবি, বর্তমানে মাউশিতে কলেজ শিক্ষকদের প্রভাব বেশি এবং মাধ্যমিক শিক্ষকদের স্বার্থ বঞ্চিত হচ্ছে। পদোন্নতির সুযোগও সীমিত। ফলে একটি আলাদা অধিদপ্তর না হলে মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন, যদি আলাদা অধিদপ্তর হয় তবে দ্বৈত শাসন চালু হবে, সমন্বয়হীনতা আরও বাড়বে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের পরিবর্তে বিপর্যয় ঘটবে। বরং তাদের দাবি, শিক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা, নতুন পদ সৃষ্টি, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ঠিক রাখা এবং শিক্ষা প্রশাসনে কার্যকর পদায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করলেই সংকট সমাধান হবে।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, প্রস্তাবিত সংস্কার মূলত প্রশাসন ক্যাডারের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। একইভাবে অতীতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন শিক্ষাকে ক্যাডারবহির্ভূত করার সুপারিশ করেছিল, যা শিক্ষা ক্যাডারের মূল স্বার্থের পরিপন্থী। তারা জোর দিয়ে বলছেন, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা শিক্ষা ক্যাডারের হাতেই থাকতে হবে, অন্য কোনো ক্যাডারের হাতে গেলে শিক্ষার টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মনে করেন, আলাদা মাধ্যমিক অধিদপ্তর হলে শিক্ষার বরাদ্দ, প্রকল্প ও উন্নয়ন কার্যক্রম সরাসরি মাধ্যমিক পর্যায়ে কাজে লাগানো সম্ভব হবে, যা বর্তমানে কলেজ পর্যায়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে।
সবশেষে শিক্ষাবিদদের একটি অংশ বলছেন, দপ্তর মানেই পদ সৃষ্টি, আর পদ মানেই ক্ষমতার লড়াই। সঠিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত না করে নতুন অধিদপ্তর গঠন করলে সমাধান আসবে না, বরং জটিলতা বাড়বে। বরং জনবল বৃদ্ধি, বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধান করা জরুরি।
সারকথা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবকে ঘিরে শিক্ষা ক্যাডার ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডাররা বলছেন, বিভাজন শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর; অপরদিকে মাধ্যমিক শিক্ষকরা মনে করছেন, স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরই মাধ্যমিক শিক্ষার বৈষম্য দূর করার একমাত্র উপায়।
Leave a Reply