মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে ভেঙে আলাদা দুটি অধিদপ্তর করার প্রস্তাব নিয়ে সম্প্রতি শিক্ষা অঙ্গনে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং তৎকালীন শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের স্বাক্ষরিত একটি প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার নিকট প্রেরণ করা হয়। তবে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
প্রসঙ্গত, পতিত শেখ হাসিনা সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রথমবারের মতো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে দুই ভাগ করার প্রস্তাব তোলা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি হতো “মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর”, যা শুধুমাত্র মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা নিয়ে কাজ করত। অপরটি হতো “উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর”, যা উচ্চমাধ্যমিক ও তার পরবর্তী স্তরের শিক্ষা দেখভাল করত। তবে শিক্ষা ক্যাডারের কঠোর আপত্তির কারণে সে সময় প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও একই প্রস্তাব তোলে। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। সেখানে সুপারিশ করা হয়, মাউশিকে দুই ভাগে ভাগ করে “মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর” এবং “কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর” গঠন করতে হবে। কমিশনের ভাষ্যমতে, মাধ্যমিক শিক্ষা অঙ্গীভূত থাকার কারণে মাধ্যমিক স্তরের প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে শিক্ষার মান ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে।
কিন্তু বিসিএস সাধারণ শিক্ষা অ্যাসোসিয়েশন এবং শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, এতে শিক্ষা প্রশাসনে অরাজকতা তৈরি হবে এবং সমন্বয় নষ্ট হবে। ফলে মার্চ ২০২৫-এর পর বিষয়টি আর আলোচনায় আসেনি। এই হলো আমাদের দেশের শিক্ষা ক্যাডার এরা শুধু নিজের স্বার্থ সিদ্ধির কথা ভাবে। ভাবেনা দেশের মঙ্গলের কথা। দেশের মঙ্গলের কথা যদি ভাবত তাহলে এত সুন্দর যুগোপোযোগী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করত না অবশ্যই। কিন্তু মিলিয়ে নিয়েন আমাদের আমলারা অবশ্যই বিরোধিতা করবেই করবে। কারণ তারা যদি বিরোধিতা না করে সায় দেয় তাহলে তাদের স্বার্থের হানি হয়তবা ঘটবে অর্থাৎ তাদের আর্থিক দূর্নীতির সুযোগ কমবে কিন্তু দেশের শিক্ষা খাতের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে।
অবশেষে ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট হঠাৎ করে শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের ও শিক্ষা উপদেষ্টা ড. আবরারের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠানো হলে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। গত শুক্রবার তা প্রকাশ্যে এলে শিক্ষা ক্যাডার মহলে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন সরকার গোপনে মাউশিকে ভাগ করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসলেও শিক্ষা ক্যাডারের আপত্তির মুখে তা বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের একটি মহল আবার সেই ষড়যন্ত্রে নেমেছে।
প্রশ্ন হলো তাদের সাথে আলোচনা কেন করবে। তারা তো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কেউ নয় যারা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের তাদের সাথে আলোচনাই করেই তো এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তারা নিশ্চয়ই ভুলে গেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার এখতিয়ার তাদের নেই। গ্রহণকৃত সিদ্ধান্ত সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব তাদের কোনরূপ অবহেলা না করে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মাউশির অধীনে রয়েছে ৯টি বিভাগীয় কার্যালয়, ৬৪টি জেলা শিক্ষা অফিস, ৫১৬টি উপজেলা শিক্ষা অফিস, ৬৮৬টি সরকারি কলেজ, ৭০৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১০৪টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশে মোট মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২১,২৩২টি, যার মধ্যে ১,৫১৪টি কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০ লাখেরও বেশি। এ বিশাল কাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস জরুরি বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করছে।
মন্ত্রণালয়ের পাঠানো প্রস্তাবে চারটি মূল ভিত্তি রয়েছে—
১. কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি)-এর সুপারিশ অনুযায়ী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএফআরসিএসসি একটি প্রতিবেদনে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও উচ্চশিক্ষা গবেষণা অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব দেয়।
২. জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর ২৭ অধ্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাকে আলাদা অধিদপ্তরে বিভক্ত করার উল্লেখ থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
৩. ২০১৪ সালের সচিব সভায় সংস্কার পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে সংস্কার পরিকল্পনা জমা দেয়, সেখানে ২০২৫ সালের মধ্যে দুটি আলাদা অধিদপ্তর গঠনের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৪. জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ—যেখানে বলা হয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষাকে পৃথক অধিদপ্তরে নিতে হবে এবং কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদ গ্রেড-১-এ উন্নীত করতে হবে।
তবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মাধ্যমিকের অন্তর্ভুক্ত হলে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। কারণ উচ্চবিদ্যালয়ে একাদশ-দ্বাদশ যোগ হলে সেগুলোর নাম স্কুলই থেকে যাবে, আর কলেজে নবম-দশম খোলা হলে তার নাম কি কলেজই থাকবে? এ ছাড়া কারা পড়াবেন—স্কুল না কলেজের শিক্ষক—এ নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে।
তাদের মতে, এর ফলে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মপরিসরও সীমিত হয়ে পড়বে। শিক্ষাবোর্ডগুলোতেও শিক্ষা ক্যাডারের পদ বিলুপ্ত হতে পারে। পরীক্ষার দায়িত্বও চলে যেতে পারে মাধ্যমিক শিক্ষকদের হাতে। এতে শিক্ষা ব্যবস্থায় অরাজকতা ও বিভ্রান্তি বাড়বে।
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দাবি, মাউশিকে ভাঙার উদ্দেশ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়, বরং প্রশাসন ক্যাডারের পদ বাড়ানো। অতীতে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর গঠনের পরও শিক্ষার মান বাড়েনি, বরং শিক্ষা ক্যাডারের পদ প্রশাসন ক্যাডারের হাতে চলে গেছে। একই অবস্থা হয়েছিল প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষায়ও।
এখানে যে বিষয়টি মূখ্য হিসাবে শিক্ষা ক্যাডারগণ দেখাচ্ছে তা হল আর বেশি শিক্ষা ক্যাডার তৈরি করাই মুল লক্ষ্য। হ্যাঁ এটাই তো লক্ষ্য হওয়া উচিত কেননা যত বেশি জনবল প্রয়োগ করা যাবে তত বেশি কাজ সহজ হতে সহজতর হবে। তত বেশি যুগোপোযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যাবে। আর এদের সমস্যা হলো লোক বেশি হলে এদেরে ভাগ কমে যাবে এই চিন্তায় তারা ব্যস্ত।
বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ও মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, অংশীজনদের সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই যদি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তবে ১৮ হাজার শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই অসন্তোষ সৃষ্টি হবে। এতে শিক্ষা সেক্টরে সমন্বয় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারকে অবশ্যই সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই তা হলো এই সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে তা হবে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত একটি যুগোপোযোগী সিদ্ধান্ত। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা হওয়ার ফলে তাদের কাজের গতি যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে কাজের মান। তেমনি মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চ শিক্ষা যদি আলাদা হয় তাহলে সেটিও হবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয় সরকার এটি বাস্তবায়নের দিকে যাবে নাকি দুর্নীতিবাজ ক্যাডারদের হুমকির মুখে পিছিয়ে আসবে। তবে শিক্ষার উন্নতির কথা যদি ধরা যায় তাহলে এটি অবশ্যই জরুরি।
Leave a Reply