এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি আসলে বাংলাদেশের শিক্ষক আন্দোলন ও নীতিনির্ধারণে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত প্রসঙ্গ। সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় একাধিক সময় কিছু ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে বাস্তবায়নের হার ও ধারা ভিন্ন। নিচে ভাতা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ দিচ্ছি—
পূর্বের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছিল। বাস্তবে তবে নির্দিষ্ট অঙ্কে (যেমন ১ হাজার টাকা) বৃদ্ধি করা হয়েছে বা হবে এই মর্মে গত ১৩ আগষ্ট জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় জানিয়েছে, কিন্তু শিক্ষকরা চান এটি শতাংশ ভিত্তিক হোক। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হলো—
বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য খুবই সামান্য চিকিৎসা ভাতা (৫০০ টাকা) বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি এক প্রকার প্রতীকি সহায়তার মত।
এটি নতুন দাবি হিসেবে শিক্ষক মহলে এসেছে, গত বিদায়ী শিক্ষা উপদেষ্টার ঘোষণার মাধ্যমে তিনিই নিজে উৎসাহী হয়ে জানিয়েছিলেন যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরাও আগামীতে সরকারী শিক্ষক কর্মচারীদের ন্যায় শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা পাবে। আর বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টা শোনাচ্ছেন এই বিষয়ে আইনের কথা এই হলো পার্থক্য। তাহলে প্র্রশ্ন জাগে বিদায়ী শিক্ষা উপদেষ্টা কি আইন বুঝে না। আইন বুঝে শুধু বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টা ও বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সচিব আমলারা। মন্ত্রণালয় বলছে— আইনগত ভিত্তি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া চালু করা সম্ভব নয়।
সরকারি চাকরিজীবীদের মতো পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা (মাসিক বেতনের সমপরিমাণ) এখনো এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পান না। কেবল সীমিত পরিমাণ ভাতা দেওয়া হয়। বিগত ১৫ বছর থেকে ছিল ২৫% কেবল গত ঈদুল আযহা থেকে শুরু হয়েছে ২৫% বৃদ্ধি করে শিক্ষকদের ৫০%। কর্মচারীরা পূর্বে থেকেও ৫০% পেত যা হয়ত আগামী ৭৫% হবে বলে আশ্বাস মিলেছে।
পরিশেষে যে বিষয়টি জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন তা হলো—এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা সংখ্যায় একটি বৃহৎ শক্তি হলেও আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ঐক্যের অভাব। ইতিহাস প্রমাণ করে, যেখানে জনগণ বা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের দাবি জানাতে সক্ষম হয়েছে, সেখানেই সফলতা এসেছে। যেমন—১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ; দুই ক্ষেত্রেই বাঙালি জাতি একসাথে দাঁড়িয়েছিল বলেই বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল। একইভাবে, সরকারি চাকরিজীবীরা যখনই সম্মিলিতভাবে তাদের দাবিদাওয়া উপস্থাপন করেছেন, তখন সরকার তাদের সুবিধা-অধিকার বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে প্রমাণ করে যে, ঐক্যই হলো সংগ্রামের মূল শক্তি।
আজ সরকার অন্যান্য সকল সেক্টরের সুযোগ-সুবিধা নিয়মিতভাবে বৃদ্ধি করছে। শিল্প, প্রশাসন, স্বাস্থ্য খাত—সবখানেই সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেই দ্বিমুখী আচরণ করা হচ্ছে? কেন সচিব-আমলারা বারবার টালবাহানা করছেন? অথচ শিক্ষাই হলো রাষ্ট্রের ভিত্তি, আর শিক্ষকরা সেই ভিত্তির প্রধান স্তম্ভ। শিক্ষককে অবহেলা করা মানে জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। তাই সরকার চাইলে আজই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভাতা, বেতন কাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে পারে; এটি শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন।
কিন্তু আমাদের দুর্বলতা হলো—আমরা নিজেরা বিভক্ত। দলীয় লেজুরবৃত্তি, ব্যক্তিগত হীনমন্যতা আর সংগঠন-ভিত্তিক বিভাজন আমাদের শক্তিকে ক্ষীণ করে দিয়েছে। এক সংগঠন অন্য সংগঠনকে ছোট করে দেখার মানসিকতা শিক্ষক সমাজকে ভেঙে দিয়েছে। অথচ যদি আমরা ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ ভুলে গিয়ে এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তবে সরকার আমাদের দাবি মানতে বাধ্য হবে।
যেমনটি আমরা দেখেছি ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে—সেই সময় বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দল নিজেদের পার্থক্য ভুলে একত্রিত হয়েছিল বলেই স্বৈরাচার পতন ঘটেছিল। একই শিক্ষা আমাদেরকেও নিতে হবে। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তবে খুব শিগগিরই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বৈষম্য দূর হবে, মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে, আর শিক্ষক সমাজ সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
Leave a Reply