এদেশের প্রায় ৫ লাখের অধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর প্রত্যাশা ছিল—তাদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও নতুন ঘোষিত শ্রান্তি বিনোদন ভাতার পরিমাণ চলতি অর্থ বছরের প্রথম মাস হতে বাড়ানো হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীগণ এই আশারই প্রহর গুনছিল। এমন প্রতিশ্রুতি ছিল পূর্বের শিক্ষা উপদেষ্টার, যিনি বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বর্তমান বাজেট সংকুলান না থাকায় তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন না হলেও আগামী অর্থবছর থেকেই এসব ভাতা বাড়বে। কিন্তু সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন আজও অনিশ্চিত রয়ে গেছে, এবং এর পেছনে প্রশাসনিক স্তরের গভীর সংকট বা আরও পরিস্কার করে বললে যেট বলতে হয় এদেশের স্বনামধন্য সচিবদের অনীহা বা বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক অনৈক্যের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাদের মধ্যে বিশেষ করে সচিব পর্যায়ে এক ধরনের অসহযোগিতা ও উদ্দেশ্যমূলক গাফিলতি দৃশ্যমান। অভিযোগ রয়েছে, এইসব সচিবরা একদিকে যেমন শিক্ষা উপদেষ্টার নির্দেশ অমান্য করছেন, অন্যদিকে তাদের কার্যকলাপে সরকারের প্রতি একপ্রকার অবজ্ঞা ও বৈরিতা প্রকাশ পাচ্ছে। তা কিন্তু অতীতে তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদ থেকে আসা নীতিগত সিদ্ধান্তকে তারা বাস্তবায়নে বিলম্ব করছেন, এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করছেন। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, প্রশাসনের এই স্তরটি মূলত উপদেষ্টা পরিষদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, যার ফলে সরকার-ঘোষিত অনেক জনবান্ধব সিদ্ধান্ত আটকে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এদেশের সাধারণ মানুষ। এদেশের যতগুলো অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বলতম পেশা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম পেশা হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের পেশা। এ পেশায় যারা কর্মরত রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে উপহাসমুলক বাড়িভাড়া, নামেমাত্র চিকিৎসাভাতা পান। তারা গত অর্থবছরের শেষে বিদায়ী শিক্ষা উপদেষ্টার ঘোষণায় আশান্বিত হয়েছিলেন যে, আগামী বছর হতে তাদের এই উপহাস আর নামমাত্র ভাতার প্রহসন থেকে পুরোপুরি না হলেও কিছুটা পরিত্রাণ মিলবে।
সচিবরা বা আমলারা যে এদেশের উপকার বা কল্যাণার্থে কোন ভাল সিদ্ধান্ত নিতে এই উপদেষ্টা পরিষদকে দিবেনা এর একটি উদাহরণ হলো, রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিমান দুর্ঘটনার কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার বাতিলের সিদ্ধান্ত উপদেষ্টা পরিষদ থেকে আসার পরেও শিক্ষা সচিব তা কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানান। অবশেষে, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, সচিবরা শুধু উপদেষ্টার নির্দেশ মানতেই অনীহা নয়, বরং তারা সরকারের জনপ্রিয়তা ও কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করতেও সচেষ্ট।
ঠিক একই ধরনের প্রবণতা এমপিওভুক্তদের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। ভাতা বৃদ্ধির প্রশ্নে সচিবদের এই প্রতিরোধমূলক মনোভাবকে অনেকেই রাজনৈতিক ও প্রতিহিংসার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। মতান্তরে বলা যায়, প্রশাসনের একটি গোষ্ঠী এখনো পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী কাঠামোর অংশীদার রয়ে গেছে। তারা এই সরকারের কোনো ইতিবাচক অর্জন বাস্তবায়ন হতে দিতে চায় না, যাতে সরকারের জনপ্রিয়তা ক্ষুন্ন হয়। তারা চায় না, শিক্ষাখাতে জনসেবার উন্নয়ন ঘটুক, কিংবা শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও জীবনমান উন্নত হোক।
এই অবস্থায় আশার আলো একমাত্র পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দিক থেকে আসতে পারে। কারণ, তিনিই পূর্বে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েই এই ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন সময় এসেছে, তিনি যেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা যেমন ভুমিকা নিয়ে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে এদেশকে একটি অতি ক্রাইসিস এর হাত হতে রক্ষা করেছেন তেমনি দৃঢ় ভূমিকা নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নির্দেশনা দিতে বাধ্য করেন। না হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাগ্যে আবারও দুর্দশা আর অবহেলা লেখা থাকবে। এবং একটি আজীবনের বৈষম্যপীড়িত পেশার ললাটে আরও একটি হতাশা খচিত হবে। কারণ, যাঁদের কাঁধে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার, যদি তাঁরাই রাজনৈতিক অভিপ্রায়ে সিদ্ধান্ত প্রতিহত করেন, তাহলে ‘জনসেবার’ ধারণাটিই ভূলুণ্ঠিত হয়।
অতএব, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নীতিনির্ধারকদের নেতৃত্বের পরীক্ষাও। এখন দেখা যাক, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সেই পরীক্ষায় কেমন উত্তীর্ণ হন।
Leave a Reply