বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন বিলম্ব: কাঠামোগত জটিলতা ও প্রশাসনিক গাফিলতির চিত্র
সর্বশেষ খবর জুন মাসের বেতনের মেসেজ আশা শুরু হয়েছে
দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত এমপিওভুক্ত প্রায় চার লাখ শিক্ষক-কর্মচারী জুন মাসের বেতন নিয়ে যে অপরিণামদর্শী যন্ত্রণা পোহাচ্ছন সেই অভিশাপ থেকে হয়তবা আজও রেহাই পাচ্ছে না এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীগণ। মাউশির ইএমআইএসসেলের ভাষ্যমতে আজ ১৬ জুলাই এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীগণ তারে জুন মাসের বেতন পেতে পারেন তবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে আজ যদি না পাওয়া যায় তাহলে আগামীকাল পাওয়া যাবে বলে নিশ্চয়তা দিয়েছে ইএমআইএসসেলের এক কর্মকর্তা। অথচ অধিকাংশ শিক্ষক কর্মচারীর একমাত্র আয়ের উৎস কিন্তু এই বেতন যা মাস শেষ হওয়ার বহু পরেও হাতে না পাওয়ার কারণে শিক্ষক সমাজ চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন অতিবাহিত করছেন। তবে সেই তিনিই আবার বলেছেন যে আজ শিক্ষক কর্মচারীগণ বেতন পেতেও পারেন। স্বাভাবিক নিয়মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও বারবার পিছিয়ে যাওয়া তারিখ এবং অস্পষ্টতা তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। মূলত, কাঠামোগত অসংগতি ও প্রশাসনিক অবহেলাই এই সংকটের জন্য দায়ী বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে।
প্রথমত, বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ হলো—অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই সময়মতো বেতনের প্রস্তাব বা বিল পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি একটি মৌলিক প্রশাসনিক ত্রুটি, যেখান থেকে গোটা প্রক্রিয়ার বিলম্ব শুরু হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা ও সময়জ্ঞান না থাকলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে বিলম্বিত হয়। এই ধাপে যদি দ্রুততা না আসে, তাহলে পরবর্তী সব ধাপেই স্থবিরতা দেখা দেয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর উদাসীনতা ও সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়াও এই সংকটকে গভীর করেছে। মাউশি থেকে ২৯ জুন বেতনের প্রস্তাব পাঠানো হলেও প্রায় ১০ দিন ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তা পড়ে থাকে কোনো অনুমোদন ছাড়াই। অবশেষে ১০ জুলাই জিও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) জারি করা হয়, কিন্তু সেটিও তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের দপ্তরে (এজি অফিস) পাঠানো হয়নি। এজিও দপ্তরে পৌঁছাতে আরও কয়েকদিন সময় লেগেছে। এই ধীর গতির প্রশাসনিক ধারা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের পথকে দীর্ঘ ও জটিল করে তুলেছে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ইএফটির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত তারিখে চলে যায়। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এই প্রক্রিয়া কার্যকর নয়। তাদের প্রতিমাসেই নতুন করে অনুমোদন নিতে হয়, যা একটি দীর্ঘ এবং ধাপে ধাপে চলা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। অনুমোদনের প্রতিটি স্তরে প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও দক্ষতা না থাকলে বিলম্ব অনিবার্য হয়ে পড়ে। এমন কাঠামো ইএফটির প্রকৃত সুবিধা থেকেও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বঞ্চিত করে রেখেছে।
এই তিনটি প্রধান কারণ—প্রতিষ্ঠানের বিলম্ব, মন্ত্রণালয়ের অবহেলা এবং কাঠামোগত জটিলতা—মিলেই জুন মাসের বেতন প্রায় অর্ধমাস বিলম্বিত হয়েছে। ইএমআইএস-এর একটি সূত্র জানিয়েছে, সমস্যা যতদিন গঠনগতভাবে সমাধান না হবে, ততদিন শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিতভাবে ইএফটির সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। অতএব, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত ও সময়োপযোগী নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply