বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকারে পরিণত হয়ে চলেছে। এই বৈষম্যগুলো দুরীকরণে বর্তমান সরকারের বিদায়ী শিক্ষা উপদেষ্টা যিনি বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরত তিনি নানামুখী আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছিলেন। তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের প্রাপ্ত ভাতাগুলো বৃদ্ধির ব্যাপারে পজিটিভ কথা শুনিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাসকৃত ভাতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনও এক অন্তহীন প্রতীক্ষার মধ্যে রয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীবৃন্দ। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতার বৃদ্ধি সহ তার ঘোষিত সরকারী চাকুরীজীবিদের ন্যায় শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীগণ প্রাপ্ত হবেন। তার কথা মতো নতুন বাজেটে এই সকল ভাতা বৃদ্ধির বরাদ্দ রাখা হবে এবং সেইমতে ভাতাগুলো বৃদ্ধি ও সংযুক্ত করা হবে। কিন্তু দুংখের বিষয় হলেও সত্যি আজ বাজেট ঘোষণার একমাস পার হয়ে গেলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের আশ্বাসকৃত ভাতাগুলোর বৃ্দ্ধির ব্যাপারে এখনও কোন প্রকার কার্যক্রম গ্রহণ না করায় শিক্ষক কর্মচারীগণ হতাশ হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করলে তারা বিভিন্ন প্রকার টালবাহানা মুলক কথাবার্তা বলে সময় পার করছে। আজ কাল পরশু, এই সমস্যা সমাধানের পর আপনাদের সমস্যা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করব। এই ধরনের টালবাহানা করে সময় অতিবাহিত করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলে।
এই বিলম্বের পেছনে প্রথমত দায়ী প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) প্রতিটি ভাতা প্রদানের জন্য যে গাইডলাইন অনুসরণ করে, তার প্রতিটি ধাপে রয়েছে ম্যানুয়াল ফাইল প্রক্রিয়া, হাতে-কলমে হিসাব যাচাই, এবং জেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একাধিক স্তরে অনুমোদন পদ্ধতি। যে কারণে কোনো প্রাপ্তি দেওয়ার ঘোষণার পর বাস্তবে তা শিক্ষকের হাতে পৌঁছাতে অনেক দিন লেগে যায়, কখনো কখনো বছর পর্যন্ত।
দ্বিতীয়ত, ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) পদ্ধতি চালু হলেও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন ও এককেন্দ্রিক তথ্যসমৃদ্ধ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এখনো গড়ে ওঠেনি। অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য ভুল থাকার কারণে তাদের নাম বরাদ্দ তালিকায় আসে না, আবার কারো ব্যাংক হিসাব নম্বর মিল না থাকলে বিল আটকে যায়। এগুলোর সমাধানে কেন্দ্রীয় হেল্পডেস্ক বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট কার্যকর নয় বললেই চলে। এই প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করে।
তৃতীয়ত, অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাবও এক বড় কারণ। ভাতার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ হয় ঠিকই, কিন্তু অনেক সময় মাউশি সময়মতো বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করে না, অথবা অর্থ বিভাগ থেকে বিল অনুমোদন পেতে বিলম্ব হয়। আবার নির্দিষ্ট কোনো ভাতা অনুমোদনের জিও (সরকারি আদেশ) প্রকাশে অজানা কারণে দেরি হয়, যা প্রক্রিয়া শুরুতেই জট সৃষ্টি করে।
চতুর্থত, জেলা শিক্ষা অফিস ও সংশ্লিষ্ট হিসাব রক্ষণ শাখার দুর্নীতিগ্রস্ত বা অসচেতন কর্মচারীদের কারণে অনুমোদিত বিল ফাইলগুলো সময়মতো ছুটে না। কিছু ক্ষেত্রে বিল পাশ করাতে হয় ‘নন-অফিশিয়াল’ মাধ্যম দিয়ে, যার জন্য শিক্ষককে হয়রানির শিকার হতে হয়। এই জটিলতা পুরো ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষকদের আস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে।
এছাড়াও রাজনৈতিক ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ভাতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বাস্তবে তার জন্য বাজেটে কোনোরূপ বরাদ্দ না রাখার ঘটনাও রয়েছে। যেমন, বৈশাখী ভাতা ২০১৫ সালে ঘোষণা দেওয়া হলেও, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের এ ভাত শুরুতেই দেওয়া হয়নি। না দেওয়ার পিছনে কলকাঠি যারা নেড়েছে তারা হলেন আমাদের দেশের স্বনামধন্য এই আমলারা। একইভাবে বর্তমানে বাড়িভাড়া বা চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া স্বত্তেও বর্তমানে কিছু দূর্ণীতিবাজ আমলাদের কারসাজির কারণে সেটার বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে। এভাবে অতীতেও দেখা গিয়েছে যে, সরকারের পরিস্কারের ঘোষণা থাকার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীর অনেক সুযোগ সুবিধা আমলারা অনেক ক্ষেত্রে আংশিক বাস্তবায়িত করেছে বা বিলম্বিতভাবে করেছে।
এই সমস্যাগুলো যে নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি তা নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও নীতিগত উদাসীনতা। একজন শিক্ষক যখন জানেন না তাঁর প্রাপ্য অধিকার তিনি কবে পাবেন, তখন সেই শিক্ষকের কাজের মনোযোগ ও পেশাগত উদ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন অবস্থা শুধু শিক্ষককে নয়, শিক্ষাব্যবস্থাকেই দুর্বল করে তোলে।
অবশেষে বলা যায়, সমস্যার মূল মূলে রয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি স্বয়ংক্রিয়, সময়নিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষক নিজ নিজ অ্যাকাউন্টে লগইন করে জানতে পারবেন—কোন ভাতা কবে আসবে, কোনটি প্রক্রিয়াধীন, কোনটিতে সমস্যা হচ্ছে। আর চাই দুর্নীতিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক প্রশাসন।
Leave a Reply